রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের স্বাক্ষর, চীন-ভারতের ওপরও চাপের আশঙ্কা!
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করলেন ট্রাম্প, রুশ তেল কেনায় চীন-ভারতসহ বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর বাড়তে পারে শুল্কের চাপ
রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের স্বাক্ষর, চীন-ভারতের ওপরও চাপের আশঙ্কা!
রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর করেছেন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। রয়টার্সও হোয়াইট হাউসের বিবৃতির বরাত দিয়ে খবরটি প্রকাশ করেছে। ফলে কংগ্রেসে পাস হওয়া বিলটি এখন আইনে পরিণত হলো।
নতুন আইনটির নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২৬’। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আইনটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ক্ষমতা দেয়। একই সঙ্গে ইরানের ওপর বিদ্যমান কিছু নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।
আইনটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাত। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মস্কোর অর্থের উৎস সংকুচিত করতে রুশ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের নতুন ক্ষমতা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম আমদানিকারক দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম ক্রেতা এবং রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করা দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের বিধান রয়েছে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে বড় আকারে জ্বালানি বাণিজ্য করা দেশগুলোর জন্য আইনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই জায়গায় বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে চীন ও ভারত। দুটি দেশই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বড় ক্রেতা। আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, নতুন মার্কিন ব্যবস্থার বড় প্রভাব চীন ও ভারতের ওপর পড়তে পারে। তবে আইন প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সর্বোচ্চ শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে সব দেশের ওপর কার্যকর হয়ে গেছে; বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা, ধনকুবের এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মস্কোকে সহায়তা করা বিদেশি নেটওয়ার্কও এর আওতায় আসতে পারে।
আইনটি কংগ্রেসে উল্লেখযোগ্য দ্বিদলীয় সমর্থন পেয়েছে। গত বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়। এর আগে আগস্টে সিনেটে এটি ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদন পেয়েছিল। এরপর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়। শুক্রবার ট্রাম্প স্বাক্ষর করার পর এটি আইনে পরিণত হয়েছে।
তবে আইনটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসসহ সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, আইনে প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অত্যন্ত বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ক্ষমতা শুধু রাশিয়াকে চাপ দেওয়ার জন্য নয়, অন্য বাণিজ্যিক বিরোধেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে আইনটির সমর্থকদের বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে আসা অর্থের প্রবাহ কমানোই মূল উদ্দেশ্য। তাদের মতে, তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে মস্কোর আয় কমানো গেলে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
আইনটির সঙ্গে প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এই নিষেধাজ্ঞা উদ্যোগ এগিয়ে নিয়েছিলেন। জুলাইয়ে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর নামেই আইনটির নামকরণ করা হয়।
নতুন আইনটি এমন সময়ে কার্যকর হলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ শুধু মস্কোর ওপর নয়, রাশিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।