গাজার হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বাঁচাতে ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি দিচ্ছে কাতার

গাজার হাসপাতাল ও জরুরি মানবিক সেবা সচল রাখতে ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি দিচ্ছে কাতার; সরবরাহে জাতিসংঘের সঙ্গে হয়েছে চুক্তি।

গাজার হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বাঁচাতে ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি দিচ্ছে কাতার

গাজার হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বাঁচাতে ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি দিচ্ছে কাতার


যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই অঞ্চলে মানবিক জীবনযাত্রা যখন থমকে দাঁড়ানোর উপক্রমে, ঠিক তখনই সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি মানবিক কার্যক্রম সচল রাখতে এগিয়ে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। গাজার ধুঁকতে থাকা হাসপাতাল এবং জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর চাকা সচল রাখার উদ্দেশ্যে প্রায় ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি অনুদান হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কাতার সরকার। একই সঙ্গে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি যেন নিরাপদে গাজায় প্রবেশ করতে পারে এবং যথাযথ স্থানে পৌঁছে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও সই করেছে দেশটি। সম্প্রতি কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মানবিক পদক্ষেপের তথ্য নিশ্চিত করেছে।


কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সম্পূর্ণ জ্বালানি গাজাবাসীর জন্য অনুদান হিসেবে প্রদান করা হচ্ছে। যার মূল লক্ষ্য হলো গাজার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা এবং সেখানে দিনরাত কর্মরত মানবিক সংস্থাগুলোকে তাদের জীবনরক্ষাকারী কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করা। গাজায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক সীমাবদ্ধতা কিংবা পুরোপুরি বিদ্যুৎহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে এখানকার ছোট-বড় সব হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমকে পুরোপুরি জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে থাকা আইসিইউ, নবজাতকদের ইনকিউবেটর, জরুরি অস্ত্রোপচার কক্ষ এবং কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো অতি সংবেদনশীল যন্ত্রগুলো ২৪ ঘণ্টা চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ একটি অপরিহার্য বিষয়।


জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ইতিপূর্বে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাজায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি প্রবেশ ও তা বিতরণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানা বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। সীমিত মজুতক্ষমতা, সীমান্ত পারাপারে দীর্ঘসূত্রতা, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে হাসপাতালগুলোতে তেল পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাতার সরকারের বিশ্বাস, নতুন এই ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি সহায়তা গাজার সংকটাক্রান্ত চিকিৎসাসেবা খাতকে নতুন করে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেবে। কাতারের হিসাব অনুযায়ী, এই জ্বালানিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সুফল পাবেন গাজার প্রায় ২১ লাখ সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিক। যাদের মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে অসহায় শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ। চিকিৎসার পাশাপাশি বেসামরিক অন্যান্য মৌলিক সেবা, যেমন পানির পাম্প ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতেও এই তেল ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
কাতারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গাজাবাসীর জন্য দোহা সরকারের এটিই প্রথম জ্বালানি সহায়তা নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষ ভাগ পর্যন্ত কাতার প্রায় ৩ কোটি লিটার জ্বালানি গাজায় মানবিক সহায়তা হিসেবে পাঠিয়েছে। সদ্য ঘোষিত ১৩ লাখ লিটারের এই অনুদানটি মূলত সেই চলমান ও ধারাবাহিক মানবিক প্রচেষ্টারই একটি নতুন অংশ। দোহা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, গাজার অভূতপূর্ব মানবিক সংকটের ভয়াবহতা কিছুটা কমানো, ফিলিস্তিনিদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ত্রাণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতেই তারা নিয়মিতভাবে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন।


তবে কাতার সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় কিছু প্রশাসনিক বিষয় এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। যেমন—এই ১৩ লাখ লিটার জ্বালানি ঠিক কোন নির্দিষ্ট তারিখ থেকে গাজায় প্রবেশ শুরু করবে, কোন সীমান্ত বা পারাপার কেন্দ্র ব্যবহার করে পুরো চালানটি পরিবহন করা হবে এবং গাজার অভ্যন্তরীণ হাসপাতালগুলোর মধ্যে এটি কী অনুপাতে বণ্টন করা হবে। প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্যে জাতিসংঘের কোন নির্দিষ্ট সংস্থা শেষ পর্যন্ত এই তেল বণ্টনের সরাসরি তদারকি করবে, তা নিয়েও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। ইতিপূর্বে জাতিসংঘের প্রকল্প সেবা সংস্থা ইউএনওপিএস গাজায় জ্বালানি প্রবেশ ও মনিটরিংয়ের কাজে যুক্ত ছিল, তাই এবারও তাদের ভূমিকা থাকার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাস্তবিকভাবে এই জ্বালানি সীমান্তে পৌঁছে গাজার ভেতরে সঠিকভাবে বিতরণ করা সম্ভব হলে তা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমাবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর