নিউইয়র্কে নতুনদের জন্য ৭ চাকরি, লাগবে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি

ডিগ্রি না থাকলেও নিউইয়র্কে চাকরির সুযোগ রয়েছে বিভিন্ন খাতে। নিরাপত্তা থেকে হোম কেয়ার, রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন—জেনে নিন যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও আবেদনের নিয়ম।

নিউইয়র্কে নতুনদের জন্য ৭ চাকরি, লাগবে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি

নিউইয়র্কে নতুনদের জন্য ৭ চাকরি, লাগবে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি


নতুন দেশে গিয়ে প্রথম চাকরি খুঁজে পাওয়া অনেক অভিবাসীর জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যস্ত শহর নিউইয়র্কেও চাকরির বাজার বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। তবে চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি না থাকলেও কিছু পেশায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স বা স্বল্পমেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করে চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নতুন অভিবাসীদের জন্য এমন সাতটি সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র হলো নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, হোম কেয়ার, খুচরা বিক্রি ও গ্রাহকসেবা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন এবং রেস্টুরেন্ট-হোটেলভিত্তিক কাজ।

নিউইয়র্ক সিটির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের লাইসেন্সিং ও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য, নগর প্রশাসনের চাকরির তথ্য, ট্যাক্সি ও লিমুজিন কমিশন এবং গণপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব খাতে বিভিন্ন ধরনের প্রবেশপর্যায়ের কাজ রয়েছে। তবে কোনো খাতেই চাকরি পাওয়া নিশ্চিত নয়। প্রার্থীর বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার শর্ত পূরণ করতে হবে।

প্রথমেই রয়েছে নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ। নিউইয়র্ক সিটির প্রশিক্ষণ সহায়তা কর্মসূচির যোগ্য পেশার তালিকায় নিরাপত্তাকর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী—দুই ধরনের কাজই রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের নিয়ম মানতে হয়। নিরস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী হতে আগ্রহীদের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমে আট ঘণ্টার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এরপর নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আরও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয় এবং পরবর্তীতেও নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। আবেদন প্রক্রিয়ায় আঙুলের ছাপ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো হোম হেলথ এইড ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা সহকারী। বয়স্ক, অসুস্থ বা দৈনন্দিন কাজে সহায়তা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন এসব কর্মী। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, অনুমোদিত হোম হেলথ এইড প্রশিক্ষণের জন্য কমপক্ষে ৭৫ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তত্ত্বাবধানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও থাকে। ব্যক্তিগত পরিচর্যা সহকারীর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। এই কাজগুলোতে ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে যোগাযোগ করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় ক্ষেত্র হলো দোকান, সুপারমার্কেট, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খুচরা বিক্রি এবং গ্রাহকসেবা। নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এসব কাজ তুলনামূলকভাবে প্রবেশযোগ্য হতে পারে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি প্রয়োজন হয় না। নিয়োগের শর্ত সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় যোগাযোগ করতে পারলে বাংলাভাষী গ্রাহক বেশি এমন কিছু প্রতিষ্ঠানে তা অতিরিক্ত সুবিধা হতে পারে। তবে শুধু বাংলা জানার কারণে চাকরি পাওয়ার কোনো সার্বজনীন সরকারি নিশ্চয়তা নেই।

চতুর্থ সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ। নিউইয়র্কে সড়ক, রেল, স্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়মিত বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়। নিউইয়র্কের গণপরিবহন কর্তৃপক্ষের ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মূলধনী পরিকল্পনার আকার প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এতে রেলপথ, স্টেশন, সংকেত ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো আধুনিকায়নে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি চাকরি পাবেন—এমন নয়। গণপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিটি পদের জন্য আলাদা যোগ্যতা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকে। তাই নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা বা কারিগরি কোনো পদে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি।

পঞ্চম ক্ষেত্র হলো ট্যাক্সি ও ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন। নিউইয়র্কে ট্যাক্সি, গাড়িভিত্তিক যাত্রী পরিবহন বা ভাড়ায় গাড়ি চালাতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চালকের লাইসেন্স প্রয়োজন। নতুন আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা এবং অন্যান্য যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চালকদের যাত্রী সহায়তা, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের সহায়তা এবং নিরাপদ গাড়ি চালানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। পাশাপাশি মাদক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে। তাই শুধু গাড়ি চালাতে জানলেই নিউইয়র্কে ট্যাক্সি বা ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের কাজে সরাসরি যোগ দেওয়া যায় না।

ষষ্ঠ সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো রেস্টুরেন্ট, খাদ্য প্রস্তুত ও হোটেলভিত্তিক কাজ। রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, হোটেল ও অন্যান্য আতিথেয়তা প্রতিষ্ঠানে রান্নাঘর, খাবার প্রস্তুত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশন এবং হাউসকিপিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রবেশপর্যায়ের পদ রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সাধারণ ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৭ ডলার হয়েছে। তবে টিপস পাওয়া কিছু কর্মীর ক্ষেত্রে মজুরি হিসাবের আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।

খাদ্যসেবা খাতে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সব সাধারণ খাদ্য প্রস্তুতকারী কর্মীর ব্যক্তিগতভাবে খাদ্য সুরক্ষা সনদ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালু থাকা অবস্থায় নির্দিষ্ট দায়িত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সনদধারী তত্ত্বাবধায়ক থাকার নিয়ম রয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা প্রশিক্ষণের অনলাইন কোর্স বিনামূল্যে করার সুযোগ রয়েছে। তবে কোর্স শেষ করলেই সঙ্গে সঙ্গে সনদ পাওয়া যায় না; নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়।

সপ্তম ক্ষেত্র হলো অফিস সহকারী, দাপ্তরিক কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকরি। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। নিউইয়র্ক সিটির ৫৫-এ কর্মসূচি নতুন অভিবাসীদের জন্য পরীক্ষা ছাড়াই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নয়। নগর প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচি মূলত নির্দিষ্টভাবে প্রত্যয়িত শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এমন যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য। যোগ্য প্রার্থীরা নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পদে লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার বিকল্প প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্ট পদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।

নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নিউইয়র্ক শহরের চাকরি মেলা বা নিয়োগ আয়োজনও একটি সম্ভাব্য সুযোগ হতে পারে। শহরের চাকরি সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সরকারি ওয়েবসাইটে অনুষ্ঠানের তারিখ, সময় ও ঠিকানা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনলাইন তালিকায় কখনো কখনো স্থানসংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তিত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে পারে।

নিউইয়র্কে নতুন অভিবাসীদের জন্য নিরাপত্তা, হোম কেয়ার, খুচরা বিক্রি ও গ্রাহকসেবা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট এবং হাউসকিপিংসহ বিভিন্ন খাতে প্রবেশপর্যায়ের কাজের সুযোগ থাকতে পারে। তবে এসব চাকরিকে ‘সহজে পাওয়া যাবে’ বা নিশ্চিত চাকরি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কাজের অনুমতি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, ভাষাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগকর্তার নিজস্ব শর্ত—সবকিছুর ওপর চাকরি পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে।

চাকরি খোঁজার সময় প্রতারণা থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাকরি নিশ্চিত করে দেওয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের টাকা চাইলে আগে সেটি যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ বা সরকারি চাকরির নামে টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নিউইয়র্ক সিটি বা নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য যাচাই করা নিরাপদ। চাকরির আবেদন ও প্রশিক্ষণের প্রকৃত নিয়ম জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়াই নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর