হুতিদের ভয়ে কি সৌদির সঙ্গে ‘পল্টি’ মারলেন ট্রাম্প? আড়ালে চলছে নতুন হিসাব

হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলা চান সৌদি যুবরাজ; ট্রাম্পের সাড়া মেলেনি, উল্টো ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

হুতিদের ভয়ে কি সৌদির সঙ্গে ‘পল্টি’ মারলেন ট্রাম্প? আড়ালে চলছে নতুন হিসাব

হুতিদের ভয়ে কি সৌদির সঙ্গে ‘পল্টি’ মারলেন ট্রাম্প? আড়ালে চলছে নতুন হিসাব


মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেন ও লোহিত সাগর। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব যখন হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চাইছে, তখন ওয়াশিংটন কেন যুদ্ধে নামছে না?

ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে ১১ সেপ্টেম্বর। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। দুই নেতার মধ্যে অন্তত দুবার ফোনালাপ হয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র তখন হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে সম্মত হয়নি। পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এখানেই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ওমানে হুতিদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রয়টার্স পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বৈঠকটি মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখে ওমান সরকার।

অর্থাৎ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী সামরিক সহযোগিতা চাইছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন একই হুতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথও খোলা রাখছে।

তবে এটিকে সরাসরি ‘হুতিদের ভয়ে ট্রাম্প সৌদির সঙ্গে পল্টি মেরেছেন’ বলা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত হবে না। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ‘হুতিদের ভয়’ প্রমাণিত হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে পুরোপুরি ছেড়ে না দিয়ে সরাসরি আরেকটি সামরিক সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতাকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক অভিযানে তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলীয় বন্দর মোখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি কয়েকটি দ্বীপ দখল করেছে। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।

হুতিদের এই অগ্রগতি শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের হিসাবই বদলাচ্ছে না; সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি করছে। এপি জানিয়েছে, হুতিরা সৌদি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। একই সময়ে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মজুত নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে বলে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে এপি।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ সতর্ক। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন সৌদি আরবের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং হুতিদের সঙ্গেও সরাসরি আলোচনা করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সৌদি বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও পরিকল্পনায় সহযোগিতার জন্য একটি টাস্কফোর্স রেখেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামার কোনো ঘোষণা দেয়নি।

এই কৌশলের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সমঝোতা। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন হুতিদের ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। কিন্তু একই বছর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে মার্কিন হামলার পর দুই পক্ষ একটি যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় পৌঁছায়। রয়টার্স-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই ইতিহাস থাকার পরও ওয়াশিংটন এখন হুতিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

হুতিদের একজন কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরেক ব্যক্তির বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে ওমানে মার্কিন ও হুতি প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা বর্তমানে মূলত সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করার কথা বলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও আপাতত সরাসরি সংঘাতে প্রবেশ করছে না। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে হুতিদের লক্ষ্যবস্তু আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

এ অবস্থায় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিকভাবে পরিত্যাগ করছে, এমন প্রমাণও নেই।

বরং ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের কাছে সর্বোচ্চ ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। প্যাকেজটিতে ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম থাকার কথা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিক্রির উদ্দেশ্য সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো।

তবে এফ-৩৫ বিক্রির অনুমোদন পাওয়া মানেই যুদ্ধবিমানগুলো দ্রুত সৌদি আরবের হাতে চলে যাচ্ছে না। চুক্তিটি রাজনৈতিক ও কংগ্রেসীয় বাধার মুখে পড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনের দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকার কারণে বিমান সরবরাহে কয়েক বছরও লাগতে পারে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে।

এই দুটি সিদ্ধান্ত পাশাপাশি রাখলে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির একটি জটিল ছবি পাওয়া যায়। একদিকে সৌদি আরবকে অত্যাধুনিক অস্ত্র দেওয়ার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং গোয়েন্দা সহায়তাও অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু করতে এখন পর্যন্ত রাজি হয়নি ওয়াশিংটন।

হুতিদের দ্রুত অগ্রগতির মানবিক মূল্যও বাড়ছে। এপি এর ১৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে আনুমানিক ১ লাখ ২৫ হাজার ইয়েমেনি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সংকটে রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ট্রাম্প সৌদির পক্ষ ছেড়ে হুতিদের পক্ষ নিয়েছেন’—এভাবে দেখাও ঠিক হবে না। আবার সৌদি আরবের প্রত্যাশা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে—এটিও সত্য নয়।

বরং ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশল তিনটি পথে এগোচ্ছে বলে ঘটনাগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে—সৌদি আরবকে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দেওয়া, দেশটির সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া এবং একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে দূরে রাখা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। হুতিরা যদি মার্কিন বাহিনী বা আন্তর্জাতিক জাহাজকে নতুন করে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে, অথবা সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। আপাতত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘হুতিদের ভয়’ নয়—বরং সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে কূটনীতি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সৌদির নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সমন্বিত নীতিই ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে বেশি স্পষ্ট।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর