নিউ ইয়র্কের সরকারি স্কুলে আশঙ্কাজনক হারে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মাঝে

নিউ ইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ক্রমাগত বাড়ছে যা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউ ইয়র্কের সরকারি স্কুলে আশঙ্কাজনক হারে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মাঝে

নিউ ইয়র্কের সরকারি স্কুলে আশঙ্কাজনক হারে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মাঝে


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতির হার নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত মেয়রের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী এবং আশঙ্কাজনক অনুপস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। করোনা মহামারীর পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে না আসার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে শিক্ষা বিভাগ নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। শহরের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থাকছে, যা শিক্ষার সার্বিক কাঠামোর জন্য এক বিরাট বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।


প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষে নিউ ইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মোট শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই ধারাবাহিকভাবে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে অবস্থান করেছে। এর আগের শিক্ষাবর্ষে এই অনুপস্থিতির হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে তথ্যের আলোকেই স্পষ্ট যে পরিস্থিতি তো উন্নত হয়ইনি, বরং সামান্য হলেও এটি আরও খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। শিক্ষাবিদ ও নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, একটি আধুনিক উন্নত শহরে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিসংখ্যান অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিতি বলতে সাধারণ ভাষায় বোঝায়, যখন একজন শিক্ষার্থী পুরো শিক্ষাবর্ষের অন্তত ১০ শতাংশ বা তার বেশি দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এই ধরনের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীর পড়াশোনার অগ্রগতিকে চরমভাবে ব্যাহত করে। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত না আসার কারণে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রম থেকে পিছিয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে তাদের পরীক্ষার ফলাফল ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষকদের মতে, যখন কোনো শিক্ষার্থী দিনের পর দিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, তখন তার পক্ষে পরে এসে পূর্বের পড়াগুলোর সাথে মানিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায় এবং শিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মান বিনষ্ট হয়।


শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, করোনা মহামারীর পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে না যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক পরিবারে আর্থিক সংকট, মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং গৃহস্থালি নানা প্রতিকূলতার কারণে শিশুরা স্কুলে আসতে পারছে না। এছাড়া গণপরিবহনের সমস্যা, অসুস্থতা এবং পারিবারিক উদাসীনতাও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। বহু শিক্ষার্থী এখন পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে এবং পারিবারিক কাজের চাপ বা অন্যান্য কারণে নিয়মিত ক্লাসে যোগদান করা থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সামাজিক পরামর্শদাতা বা কাউন্সিলরের অভাবও এই সমস্যার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় শহরের শিক্ষা বিভাগ ও প্রশাসন বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তা বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন কার্যকারী ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রশাসন থেকে অনুপস্থিতি কমানোর জন্য অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রণোদনা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা প্রদানের কথা বলা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সময়মতো তাদের সাথে যোগাযোগ করা হয় না বা সমস্যা সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কার্যকর পথ তৈরি করা হয় না। অনেক স্কুলের অবকাঠামো ও পরিবেশ শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার কারণে স্কুলে আসার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী সামাজিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি, স্কুলগুলোর সার্বিক পরিবেশ উন্নত করা, পাঠদান পদ্ধতিকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজ করা এবং প্রতিটি স্কুলে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা প্রয়োজন। অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে একসাথে কাজ করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা আবার নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসে।


যদি এই দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিতির ধারা দ্রুত বন্ধ না করা যায়, তবে নিউ ইয়র্কের শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হবে বলে মনে করছেন নীতি নির্ধারকরা। একটি সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে পুনরায় ক্লাসমুখী করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। কেবল আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এই জাতীয় সমস্যা সমাধানের শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া সময়োপযোগী ও অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর