সৌদি নিরাপত্তায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, বাড়ছে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি

হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়ার হুমকিতে সৌদিকে সরাসরি রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, ভেনেজুয়েলার তেল আমদানিতে বাড়ছে ওয়াশিংটনের নির্ভরতা বলে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

সৌদি নিরাপত্তায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, বাড়ছে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি

সৌদি নিরাপত্তায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, বাড়ছে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি


মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব হুথিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চাইলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সরাসরি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

রয়টার্সের ১১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হুথিদের ওপর মার্কিন হামলা অনুমোদন করেননি। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।


একই বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে উল্লেখযোগ্য গোয়েন্দা ও লক্ষ্য নির্ধারণ সহায়তা দিলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলার কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। তবে লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর হুমকি আরও বাড়লে নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


ওয়াশিংটনের এই অবস্থান এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে তাদের সামুদ্রিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য ইউরোপ, এশিয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে পরিবহন করা হয়।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অগ্রগতি লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর আগে সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচলও হুথি হামলার কারণে ব্যাহত হয়েছে। জুলাইয়ে দুটি চীনা সুপারট্যাংকার সৌদি আরবের প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগর থেকে বেরিয়ে যায়। একই সময়ে অন্য সৌদি জাহাজগুলো হামলার মুখে পড়েছিল।


সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে। হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথের ওপরও নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে।


১২ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনায় ইরান জড়িত থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ওই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। হামলার পর পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। এই সামরিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানির চিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি ক্রমাগত বাড়িয়েছে।


ইআইএর মাসিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২ লাখ ৩১ হাজার, মার্চে ৩ লাখ ৭৩ হাজার, এপ্রিলে ৪ লাখ ২৯ হাজার, মে মাসে ৪ লাখ ৭১ হাজার এবং জুনে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছে।


পরবর্তী সাপ্তাহিক তথ্যেও আমদানি আরও বেশি দেখা গেছে। আগস্টের কয়েক সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ ৪৩ হাজার ব্যারেলের মধ্যে ছিল। সেপ্টেম্বরের ৪ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে তা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৯৯ হাজার ব্যারেল এবং ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে প্রায় ৭ লাখ ৮২ হাজার ব্যারেল।


অর্থাৎ ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানি বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন—এমন একটি স্থায়ী আমদানি গড় এখনো সরকারি মাসিক ইআইএ তথ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই ওই সংখ্যাকে স্থায়ী গড় হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে সৌদি আরব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনেক কমেছে। ইআইএর সাপ্তাহিক তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাইয়ের বেশ কয়েকটি সপ্তাহে সৌদি আরব থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল আমদানি শূন্য বা খুবই কম ছিল। আগস্টের শেষ সপ্তাহে তা প্রায় ৩ লাখ ৭৯ হাজার ব্যারেল এবং সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ শেষ হওয়া সপ্তাহে প্রায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ব্যারেল দৈনিক ছিল।


এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎস হিসেবে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব বেড়েছে, যখন সৌদি আরব থেকে আমদানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কমেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা হারিয়েছে। বরং মার্কিন পরিশোধনাগারগুলো বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে এবং সরবরাহের উৎস সময় ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।


ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল। এর মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশ এসেছিল কানাডা ও মেক্সিকোসহ আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলো থেকে।


তেলের উৎস পরিবর্তনের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তায় সহায়তা করতে আগ্রহী হলেও প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি মার্কিন বাহিনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমিত ও শর্তযুক্ত অবস্থান নিচ্ছে।


সৌদি আরবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানও সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতা করছে, কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা একই সঙ্গে লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।


এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল বিক্রি, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার নেটওয়ার্ক এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। মে মাসে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের দাবিকৃত কথিত ‘টোল’ পরিশোধের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছিল।


ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সৌদি আরবের নিরাপত্তা, লোহিত সাগর ও হরমুজের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহের বৈচিত্র্য।


ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানি বৃদ্ধির ফলে ওয়াশিংটনের জ্বালানি সরবরাহে পশ্চিম গোলার্ধের গুরুত্ব আরও দৃশ্যমান হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানির ওঠানামা দেখাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরাসরি মার্কিন জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


তবে সৌদি আরবকে সামরিকভাবে রক্ষা করার প্রশ্নকে শুধু তেল আমদানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সৌদি নীতির সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, ইরান-সংক্রান্ত কৌশল এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতিও জড়িত।


বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো—সৌদি আরবকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া হবে, কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযান এখনই নেওয়া হচ্ছে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি ২০২৬ সালে দ্রুত বেড়েছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা সৌদি আরব থেকে আমদানির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।

এই পরিবর্তনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও জ্বালানি নীতির পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর