ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে ট্রাম্প, ফের হামলার হুমকি
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের মুখে ট্রাম্প, ফের ভয়াবহ হামলার হুমকি, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে ট্রাম্প, ফের হামলার হুমকি
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে ইরানের ওপর আবারও বড় পরিসরে সামরিক হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios।
Axios-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার চেষ্টা করবেন, নাকি হামলার মাত্রা কমিয়ে অন্য কোনো পথ বেছে নেবেন—এ নিয়ে তিনি ভাবছেন।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত আসছে। আমি কি ইরানকে ধ্বংস করে দিতে চাই, নাকি চাই না—এটি বড় সিদ্ধান্ত। আমার ক্ষেত্রে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।”
ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালানোর হুমকি ট্রাম্প এর আগেও দিয়েছেন। তবে এবার তাঁর বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এটি এমন সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নিয়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনাও প্রকাশ্যে আলোচনা হচ্ছে।
আগামী মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। বৈঠকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের নেতারা বা তাঁদের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওই বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, নৌ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লেও তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সংঘাতের প্রভাব থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত নয়।
ট্রাম্প এর আগে যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং তিনি আশা করছেন সংঘাত শেষের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক হামলার সম্ভাবনার কথা বলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সামরিক চাপ ও কূটনীতির মধ্যে দ্বৈত পথের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর তেহরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা, ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে জ্বালানি ও নৌপথের ক্ষেত্রে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এদিকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি তদন্তেও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত তদন্তকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। প্রতিবেদনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি হামলার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ওই তদন্তের সমালোচনা করেছে এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনি চাপও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি বড় পথ রয়েছে—ইরানের ওপর সামরিক চাপ আরও বাড়ানো অথবা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসানের চেষ্টা করা। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কোন পথ বেছে নেবে, তা নিশ্চিত নয়।
আগামী মঙ্গলবার উপসাগরীয় ছয় দেশের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈঠকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধ শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ফলে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।