ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

ইয়েমেনে হুথিদের নতুন অগ্রযাত্রায় বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা চাপে, বাস্তুচ্যুত এক লাখের বেশি মানুষ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও বাড়ছে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ।

ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ


ইয়েমেনে হুথি বাহিনীর নতুন সামরিক অগ্রযাত্রা দেশটির দীর্ঘদিনের সংঘাতকে আবারও তীব্র করে তুলেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সংঘাতও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের ভেতরে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও অনেকে সমুদ্রপথে প্রতিবেশী জিবুতিতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অগ্রযাত্রার কারণে এক লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৭ হাজার শিশু রয়েছে। অনেক পরিবার খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে যেসব মানুষ নিজেদের বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন, তাদের একটি অংশ ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। 

ইয়েমেনের পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালি। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা এই এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের কৌশলগত প্রভাব বাড়িয়েছে। 

বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। তাই এখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং পণ্যের মূল্যেও প্রভাব পড়তে পারে।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১২ এবং গত ১০ দিনের গড় ছিল ১৭টি। তবে জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ থাকা কিছু জাহাজ এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। 

এই পরিস্থিতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—একই সময়ে চাপের মধ্যে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন হয়, আর বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত।

ইয়েমেনের সংঘাতের সামরিক দিকও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোতে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এই অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্যও নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। 

হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পেছনে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবও রয়েছে। হুথিরা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা একটি ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান করছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও জড়িয়ে আছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলার সতর্কতা জারি হওয়ার খবরও এসেছে। 

এদিকে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর সংঘাতের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বহু পরিবার অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এপি জানিয়েছে, কিছু পরিবার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। আবার কেউ কেউ সমুদ্রপথে জিবুতিতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই যাত্রা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংঘাতের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

ইয়েমেন এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটগুলোর একটি মোকাবিলা করছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাস্তুচ্যুতি দেশটির মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। নতুন সংঘাত সেই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিরা গত কয়েক দশকে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে এখন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আধুনিক অস্ত্র রয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের প্রভাব দেখিয়েছে। 

হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা বাড়ছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোষ্ঠীটি নতুন ধরনের অস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের পাশাপাশি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। 

অন্যদিকে, ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে একই সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও ১৭ সেপ্টেম্বর তেলের আন্তর্জাতিক দাম কিছুটা কমেছে, তবু ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৪ ডলারের ওপরে ছিল। 

বাজারে এই ধরনের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক কূটনীতি। সংঘাত কমাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন হলেও সামরিক অগ্রযাত্রা ও পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সহিংসতা তুলনামূলকভাবে কমেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াই সেই স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। 

বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইয়েমেনের সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হিসেবে থাকবে না। সৌদি আরব, ইরান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ এতে আরও সরাসরি যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও চাপ বাড়তে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর