কিয়েভে রাশিয়ার বড় ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা, ইউক্রেনে নতুন করে আবার বাড়ছে যুদ্ধের উত্তেজনা
রাশিয়ার রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি, আহত বহু মানুষ, পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও।
কিয়েভে রাশিয়ার বড় ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা, ইউক্রেনে নতুন করে আবার বাড়ছে যুদ্ধের উত্তেজনা
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে রাতভর বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় আবাসিক ভবন, বিভিন্ন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিয়েভ, ওদেসা ও জাপোরিঝঝিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভূখণ্ডের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে কিয়েভ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের আটটি অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। হামলায় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি প্রায় ১৬০টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়েভ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জরুরি বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়েছেন।
এপি জানিয়েছে, কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার রাতভর হামলায় অন্তত ১৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। কিয়েভ শহরের সামরিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১০টির বেশি স্থানে হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে এবং বৃহত্তর কিয়েভ অঞ্চলে ৩৩টি স্থাপনা বা স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরীক্ষা করতে জরুরি বিভাগের কর্মীরা কাজ শুরু করেন।
ওদেসা শহরেও হামলার প্রভাব পড়েছে। সেখানে আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় এই গুরুত্বপূর্ণ শহরে হামলার ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামলার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনের সুমি ও ওদেসা অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলার প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থা আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। শীতের আগে এ ধরনের অবকাঠামোয় হামলা ইউক্রেনের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিস্তৃত নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কসংক্রান্ত একটি আইন অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতসহ নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার অভিযোগ থাকা তেলবাহী জাহাজের ওপরও চাপ বাড়ানোর বিধান রয়েছে। আইনটি কার্যকর করতে পরবর্তী পর্যায়ের অনুমোদন ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের বিষয় রয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া এসেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, মস্কো নতুন মার্কিন পদক্ষেপকে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজকে রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। তবে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে এখনো কোনো বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়নি। কয়েক দফা আলোচনার পরও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ভূখণ্ড এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
রাশিয়ার হামলার জবাব দেওয়ার কথাও জানিয়েছে ইউক্রেন। এপি জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগার এবং রোস্তভ অঞ্চলের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। তবে এসব হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাতের হামলায় বিপুলসংখ্যক আকাশপথের হুমকি শনাক্ত করা হয়েছিল। ইউক্রেনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার দাবি করেছে। তবে একই সঙ্গে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
এই হামলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, কৃষ্ণসাগরের ওদেসা উপকূলের কাছে একটি তানজানিয়ার পতাকাবাহী বেসামরিক জাহাজ রুশ ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় জাহাজের ক্যাপ্টেন নিহত এবং আরও তিনজন নাবিক আহত হয়েছেন। বেসামরিক জাহাজে হামলার ঘটনা কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনের ওপর জ্বালানি ও অবকাঠামোগত চাপও বাড়ছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগের মুখে রয়েছে। মস্কো অবশ্য বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং তাদের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ন্যাটো দেশগুলোও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সস্তা ও দ্রুতগতির ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে এবং ন্যাটোর প্রচলিত অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধ এখন ইউক্রেন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া দ্রুতগতির নতুন ধরনের ড্রোন ব্যবহার বাড়িয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এগুলো আগের ধীরগতির ড্রোনের তুলনায় শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন। ইউক্রেনও কম খরচে তৈরি প্রতিরোধী ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
এই হামলার সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে মস্কো বলছে এমন পদক্ষেপ শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে বড় কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থাকলেও ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ফলে কিয়েভে আজকের হামলা যুদ্ধের সামরিক দিকটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। এতে বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইউক্রেনও রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।