ট্রাম্পের নতুন ভিসা নিয়মে আদালতের বাধা, স্বস্তি পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের চার বছরের ভিসা নিয়ম আটকে দিল মার্কিন আদালত, আপাতত বহাল থাকছে পুরোনো ডিএস ব্যবস্থা।
ট্রাম্পের নতুন ভিসা নিয়মে আদালতের বাধা, স্বস্তি পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা
যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, এক্সচেঞ্জ ভিজিটর ও বিদেশি সাংবাদিকদের অবস্থানের সময়সীমা নির্দিষ্ট করার ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ঠিক এক দিন আগে আটকে দিয়েছে ফেডারেল আদালত। ফলে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তা আপাতত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
১৪ সেপ্টেম্বর ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক এফ. ডেনিস সেলর চতুর্থ নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলার সময় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নতুন নিয়মটি বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
নতুন নিয়মটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ বা ডিএস ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ ছিল। বর্তমান ব্যবস্থায় এফ-১ শিক্ষার্থীরা তাদের অনুমোদিত শিক্ষাক্রমের শর্ত মেনে চললে সাধারণত তাদের পড়াশোনা বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সময়কাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারেন। আদালতের সাম্প্রতিক আদেশের ফলে আপাতত এই ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এফ-১ শিক্ষার্থী ও জে-১ এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের কথা ছিল। সাধারণভাবে এই সময়সীমা চার বছরের বেশি হওয়ার কথা ছিল না। কোনো শিক্ষার্থী বা এক্সচেঞ্জ ভিজিটরের কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হতো।
নতুন নিয়মে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা চালুর পরিকল্পনা ছিল। অধিকাংশ বিদেশি সাংবাদিকের জন্য আই-ভিসার অবস্থানকাল সর্বোচ্চ ২৪০ দিন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ দশক ধরে চালু থাকা ডিএস ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদের অনুমতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এই নিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের বক্তব্য ছিল, বিশেষ করে পিএইচডি, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে চার বছরের সীমা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। শিক্ষাক্রম শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হলে নতুন করে অনুমতির আবেদন করতে হতো, এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত।
নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চশিক্ষা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি জোট মামলা করে। মামলাকারীদের মধ্যে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার্স বা নাফসা, প্রেসিডেন্টস অ্যালায়েন্স অন হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন এবং আরও কয়েকটি সংগঠন রয়েছে। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নতুন নিয়মের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
বিচারক সেলর সরকারের দেওয়া নতুন নিয়মের যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও জালিয়াতি ঠেকানোর যে কারণ দেখিয়ে নিয়মটি আনা হয়েছে, তার পক্ষে সরকারের যুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। একই সঙ্গে আদালত মনে করেছে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও স্কলার অফিস জানিয়েছে, আদালতের আদেশের কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন নিয়ম কার্যকর হচ্ছে না। ফলে এফ-১ শিক্ষার্থী ও জে-১ এক্সচেঞ্জ ভিজিটররা আপাতত আগের ডিএস কাঠামোর অধীনেই থাকবেন। কর্মসূচির নিয়ম মেনে চললে তাদের নতুন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আলাদা করে ‘এক্সটেনশন অব স্টে’ আবেদন করার প্রয়োজন হচ্ছে না।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও জানিয়েছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা অবস্থায় ডিএস ব্যবস্থা বহাল থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জানিয়েছে, আদালতের আদেশের কারণে নতুন নিয়মের বিধিনিষেধ আপাতত তাদের ওপর কার্যকর হচ্ছে না।
আদালতের সিদ্ধান্তকে নতুন নিয়মের স্থায়ী বাতিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা। মূল মামলার শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলবে। সরকার চাইলে আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে ২ অক্টোবরের স্ট্যাটাস কনফারেন্স রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি এফ-১ শিক্ষার্থীদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো চার বছরের সীমা কার্যকর হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের নিজেদের বৈধ শিক্ষার্থী স্ট্যাটাস বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েলও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে নিজেদের অভিবাসন-সংক্রান্ত শর্ত মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নতুন নিয়মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। আদালতের বর্তমান আদেশ পরিবর্তিত হলে আবার নির্দিষ্ট মেয়াদের নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্বস্তি পেলেও এটি চূড়ান্ত বিজয় নয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা পর্যন্ত পুরোনো ডিএস ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে; আর মূল মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।