নেতানিয়াহুর সাজসজ্জায় লাখ লাখ ডলার! ভাইরাল দাবির পেছনের আসল তথ্য কী?

নেতানিয়াহু-সারার সাজসজ্জায় সরকারি খরচের ৯০ শতাংশ, ২০১৯ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ব্যয় ১৪ লাখ ৩০ হাজার শেকেল।

নেতানিয়াহুর সাজসজ্জায় লাখ লাখ ডলার! ভাইরাল দাবির পেছনের আসল তথ্য কী?

নেতানিয়াহুর সাজসজ্জায় লাখ লাখ ডলার! ভাইরাল দাবির পেছনের আসল তথ্য কী?


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর স্ত্রী সারার সাজসজ্জা নিয়ে দেশটিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি নথি থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর চুলের সাজ, মেকআপ এবং সরকারি প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত ব্যয়ে মোট প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার ইসরায়েলি শেকেল খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কত হবে তা নির্ভর করবে বর্তমান বিনিময় হারের ওপর। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৪ লাখ ৩০ হাজার শেকেলের মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এই পুরো অর্থ শুধু নেতানিয়াহুর চুল ও মেকআপের পেছনে খরচ হয়নি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ১৪ লাখ ৩০ হাজার শেকেলের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীদের চুল সাজানো ও মেকআপের ব্যয়, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে যুক্ত কিছু খরচ। সরকারি প্রতিনিধিত্বের ব্যয়ের মধ্যে পোশাক ও আতিথেয়তার মতো বিষয়ও রয়েছে।

তবে চুল ও মেকআপের খরচের বড় অংশই নেতানিয়াহু ও তাঁর স্ত্রী সারার সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত চুল ও মেকআপসংক্রান্ত ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ নেতানিয়াহু ও সারার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই তথ্য প্রকাশ্যে আসে ইসরায়েলের মুভমেন্ট ফর ফ্রিডম অব ইনফরমেশন-এর উদ্যোগের পর। সংগঠনটি সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছিল। তথ্য না পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট নথি সরবরাহ করে।

২০২৩ সালে এসব খাতে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার শেকেল। এর আগের বছর, যখন নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ব্যয় ছিল প্রায় ৮৪ হাজার শেকেল। আর ২০২৫ সালে বার্ষিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার শেকেলে পৌঁছায়, যা পর্যালোচনা করা সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক ব্যয়।

২০২৩ সালের যুদ্ধ শুরুর সময়ের আশপাশের ব্যয়ের হিসাবও নথিতে রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজানোর জন্য প্রায় ৭ হাজার ৮৯৭ শেকেল এবং মেকআপের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৮০০ শেকেল ব্যয় দেখানো হয়েছে। শুধু অক্টোবর ২০২৩-এর একটি হিসাবে নেতানিয়াহুর চুল সাজানোর জন্য ২ হাজার ৪৫৭ শেকেল খরচের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও সাজসজ্জার খরচ হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহুর চার দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মেকআপ শিল্পী ও হেয়ারস্টাইলিস্টের জন্য প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেকটি ওয়াশিংটন সফরে এই ধরনের খরচ ছিল প্রায় ১১ হাজার ৫০০ ডলার।

সরকারি প্রতিনিধিত্বের খরচও আলাদা করে প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৯ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এই খাতে নেতানিয়াহুর জন্য প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার শেকেল, নাফতালি বেনেটের জন্য প্রায় ৫৭ হাজার শেকেল এবং ইয়ার লাপিদের জন্য প্রায় ৮ হাজার শেকেল ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যয় ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার শেকেল।

তথ্য অধিকার সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রীদের পোশাক, গয়না এবং বাহ্যিক উপস্থিতি নিয়ে পরামর্শের খরচ সম্পর্কেও তথ্য চেয়েছিল। কিন্তু এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে নথির কিছু অংশে হেয়ারস্টাইলিস্ট ও মেকআপ শিল্পীদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এর কারণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করেছে।

তথ্য অধিকার আন্দোলনের প্রধান নির্বাহী হিদাই নেগেভ সরকারি অর্থ ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন। সংগঠনটির বক্তব্য, সরকারি অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে এবং তথ্য পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হওয়া নিয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছে।

নেতানিয়াহু কোনো আইন ভেঙেছেন বা দুর্নীতি করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রকাশিত নথি মূলত সরকারি অর্থের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেছে। এসব ব্যয় বেআইনি ছিল—এমন কোনো তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘নেতানিয়াহুর চুল-মেকআপে ইসরাইলের ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার খরচ’ এই বক্তব্যকে সরাসরি সত্য বলা যাবে না। আরও নির্ভুলভাবে বলা যায়, ২০১৯ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীদের চুল, মেকআপ ও সরকারি প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে মোট প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার শেকেল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে চুল ও মেকআপ ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ নেতানিয়াহু ও তাঁর স্ত্রী সারার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভাইরাল দাবিটির মূল ভিত্তি সত্য হলেও ‘পুরো ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার শুধু নেতানিয়াহুর চুল-মেকআপে খরচ হয়েছে’ এটি সঠিক নয়। প্রকৃত তথ্য হলো, সাত বছরের বেশি সময়ে প্রধানমন্ত্রীদের সাজসজ্জা ও সরকারি প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যয়ের মোট হিসাব প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার শেকেল।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর