আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে বড় ছাঁটাই, ১৭টি পত্রিকায় ৯০ সাংবাদিক চাকরিচ্যুত

ডিজিটাল পরিবর্তন, বিজ্ঞাপনী আয় কমে যাওয়া ও গ্রাহকসংখ্যার চাপের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আবারও বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে বড় ছাঁটাই, ১৭টি পত্রিকায় ৯০ সাংবাদিক চাকরিচ্যুত

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে বড় ছাঁটাই, ১৭টি পত্রিকায় ৯০ সাংবাদিক চাকরিচ্যুত


যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আবারও বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটির অন্যতম বড় সংবাদপত্র মালিক প্রতিষ্ঠান ম্যাকক্ল্যাচি ১৭টি প্রকাশনায় ৯০ জনের বেশি ইউনিয়নভুক্ত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিয়েছে। এই ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়েছে দ্য মিয়ামি হেরাল্ডসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে।

নিউজগিল্ড-সিডব্লিউএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ম্যাকক্ল্যাচির ইউনিয়নভুক্ত কর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশের ওপর এই ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়েছে। সংবাদমাধ্যমটির মালিকানাধীন স্যাক্রামেন্টো বি, কানসাস সিটি স্টার, শার্লট অবজারভার, ফোর্ট ওর্থ স্টার-টেলিগ্রামসহ একাধিক পত্রিকায় কর্মী কমানো হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো মিয়ামি হেরাল্ড। সেখানে ৩২টি পদ বিলুপ্ত হয়েছে। একই সময়ে স্প্যানিশ ভাষার এল নুয়েভো হেরাল্ডের পুরো লেখক দলের পদও ছাঁটাইয়ের আওতায় এসেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাঁটাই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দুই দশক ধরে সংবাদপত্র শিল্প বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় স্থানীয় পত্রিকাগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল মুদ্রিত কাগজের বিজ্ঞাপন ও সাবস্ক্রিপশন। কিন্তু ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পর সেই ব্যবসায়িক কাঠামো ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।

অনলাইন সংবাদ পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু অনেক পাঠক বিনামূল্যে সংবাদ পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য পাঠকের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা কঠিন হয়েছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের বড় অংশ গুগল, মেটা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে চলে গেছে।

ম্যাকক্ল্যাচির পক্ষ থেকে কর্মীদের জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছর স্থানীয় সংবাদে বিনিয়োগ ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহকদের আগ্রহ সেই বিনিয়োগকে টেকসই করার মতো পর্যায়ে ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা। তাদের আশঙ্কা, সাংবাদিক কমে গেলে স্থানীয় প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার ওপর স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের নজরদারি দুর্বল হয়ে যাবে।

একটি স্থানীয় সংবাদপত্র শুধু বড় জাতীয় খবর প্রকাশ করে না। শহরের স্কুল বোর্ড, সিটি কাউন্সিল, কাউন্টি সরকার, স্থানীয় আদালত, পুলিশ বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রমও সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা পর্যবেক্ষণ করেন।

কোনো এলাকায় সাংবাদিকের সংখ্যা কমে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ঘটনা সংবাদে জায়গা নাও পেতে পারে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। কারণ একটি বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে অনেক সপ্তাহ বা মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

ম্যাকক্ল্যাচির কয়েকটি পত্রিকায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পদও কমানো হয়েছে। শার্লট অবজারভারে থাকা দুইজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের পদ বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। কানসাস সিটি স্টারেও সরকারি জবাবদিহি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংখ্যা কমেছে।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি পত্রিকাতেও সাংবাদিক কমানো হয়েছে। এর ফলে কিছু এলাকায় সিটি হল, কাউন্টি সরকার বা স্থানীয় স্কুল ব্যবস্থা নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করার মতো কোনো নির্দিষ্ট সাংবাদিক থাকবে না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এই পরিবর্তন শুধু সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নাগরিকদের জানাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশি আমেরিকানদের ক্ষেত্রেও এর একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির নিজস্ব সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদকর্মীরা কমিউনিটির বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন।

মূলধারার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক কমে গেলে অভিবাসী সম্প্রদায়ের অনেক বিষয়ও সংবাদে কম জায়গা পেতে পারে। নতুন ব্যবসা, স্থানীয় নির্বাচন, স্কুল, পুলিশি ঘটনা, আদালতের মামলা, অভিবাসন এবং কমিউনিটি ইস্যুগুলো নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করার সুযোগ কমে যেতে পারে।

তবে সংবাদমাধ্যমের সংকটের আরেকটি দিকও রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠকের আচরণ দ্রুত বদলেছে। মানুষ এখন মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খবর পেতে চায়। ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ছোট আকারের কনটেন্টের প্রতিযোগিতা বেড়েছে।

এই বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমগুলোকে একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মান ধরে রাখা এবং ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন, সদস্যভিত্তিক মডেল, ভিডিও, পডকাস্ট এবং বিশেষ কনটেন্টের দিকে যাচ্ছে।

কিন্তু সাংবাদিকতার মূল কাজ—তথ্য যাচাই, মাঠে গিয়ে রিপোর্ট করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা—এসব কাজের জন্য জনবল প্রয়োজন। ফলে সাংবাদিক কমে গেলে সংবাদ উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি সংবাদ যাচাইয়ের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ম্যাকক্ল্যাচির সাম্প্রতিক ছাঁটাই তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ হলো, যদি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ স্থানীয় সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।

আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—কীভাবে ডিজিটাল যুগে পাঠকের আস্থা ধরে রেখে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়া যায়। সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক মডেল বদলালেও স্থানীয় সাংবাদিকতার প্রয়োজন শেষ হয়নি।

বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর খবর বাড়ার সময়ে যাচাই করা স্থানীয় সংবাদ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ম্যাকক্ল্যাচির কর্মী ছাঁটাই যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদশিল্পে শুধু আরেকটি চাকরি হারানোর ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর