ইরান যুদ্ধ শেষের আভাস দিলেন ট্রাম্প, কমতে পারে তেলের দাম
ডাবলিনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আশাবাদী ট্রাম্প; যুদ্ধ শেষ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইরান যুদ্ধ শেষের আভাস দিলেন ট্রাম্প, কমতে পারে তেলের দাম
আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাম্প্রতিক রয়টার্স প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মনে করছেন যুদ্ধ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হতে পারে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এরই মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং বিশ্ববাজারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে তেলের দাম কমতে পারে—ট্রাম্পের এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডাবলিন সফরের সময় ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলি এবং প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ, ইউরোপের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি খুব বেশি দূরে নয়। তার বক্তব্যে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনও উঠে আসে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ সম্ভবত নির্বাচনের পরপরই শেষ হবে। তবে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কোনো শান্তি আলোচনা চলছে কি না কিংবা ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনো চুক্তির অগ্রগতি হয়েছে কি না—সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন।
এদিকে শনিবারই সৌদি আরব তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার কারণে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
পাইপলাইন বন্ধের ঘটনা বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক। দেশটির সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
ডাবলিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানকে সম্ভাব্যভাবে দায়ী করেন। তিনি বলেন, হামলার পেছনে ইরানের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার কথা হয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প। তাকে নিজের ভালো বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে পাইপলাইন হামলার দায় এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে হয়েছে বলে সৌদি আরব ও ইরাক জানিয়েছে। ইরাক এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত দায় ও পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথিদের কর্মকাণ্ডও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিরা তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা চায় না যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ুক। একই সময়ে হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাস্তবে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তেলের দাম। যুদ্ধ শেষ হলে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জ্বালানির দাম নিয়ে চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে হোয়াইট হাউস তেলের পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইনের ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বাভাস বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়। প্রেসিডেন্টের বক্তব্য আশাবাদী হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, ইরানের অবস্থান, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা এবং জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা—সবকিছুই এর ওপর প্রভাব ফেলবে।
এদিকে আয়ারল্যান্ড সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে মাইকেল মার্টিনের বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ইউরোপের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে মার্টিন ইরান সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং ইউরোপীয় অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব নিয়েও আলোচনা করতে পারেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা ফিরলে তেলের দাম কমার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর জ্বালানি ব্যয়ের চাপও কিছুটা কমতে পারে।
সব মিলিয়ে ডাবলিনে ট্রাম্পের বক্তব্য ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার দুই ক্ষেত্রেই নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে যুদ্ধ সত্যিই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হবে কি না এবং তেলের দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।