রাশিয়া-ভারতের নতুন মহাপরিকল্পনা, ২০৩০ সালেই বাণিজ্য ছুঁবে ১০ হাজার কোটি ডলার

রাশিয়া-ভারতের বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি ডলারে নিতে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা বাড়াবে দুই দেশ।

রাশিয়া-ভারতের নতুন মহাপরিকল্পনা, ২০৩০ সালেই বাণিজ্য ছুঁবে ১০ হাজার কোটি ডলার

রাশিয়া-ভারতের নতুন মহাপরিকল্পনা, ২০৩০ সালেই বাণিজ্য ছুঁবে ১০ হাজার কোটি ডলার


রাশিয়া ও ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও শিল্প উৎপাদনসহ কৌশলগত বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বৈঠকের পর। 

দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া ও ভারতের বাণিজ্য রেকর্ড প্রায় ৬ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। তবে এই বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, জ্বালানি, সার ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করলেও রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৯০ কোটি ডলার, বিপরীতে রাশিয়া থেকে আমদানি ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার। 

নতুন লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাই শুধু রুশ জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে ভারত থেকে রাশিয়ায় পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল সম্প্রতি দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই লক্ষ্যে দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি ডলারে নেওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের পারস্পরিক বিনিয়োগ ৫ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যও তুলে ধরেছেন। 

ভারতের রাশিয়ায় রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ওষুধ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, চা, কফি, মসলা, সামুদ্রিক পণ্য ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব পণ্যের কয়েকটি খাতে রাশিয়ার বাজারে ভারতের রপ্তানি বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যকে আরও বহুমুখী করাই এখন অন্যতম লক্ষ্য। 

জ্বালানি খাত অবশ্যই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা হয়ে উঠেছে। ভারতের যুক্তি হলো, বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

তবে দুই দেশ জ্বালানি সহযোগিতাকে শুধু অপরিশোধিত তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। পারমাণবিক বিদ্যুৎ, তেল পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যাল, জ্বালানি অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রাশিয়ার তৈরি পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়েও দুই দেশের আলোচনা চলছে। 

প্রতিরক্ষা খাতেও রাশিয়া-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার দিকেও দুই দেশ এগোচ্ছে। ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ উন্নয়ন ও উৎপাদন দুই দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের অন্যতম বড় উদাহরণ। ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা উৎপাদন আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজ। আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির জন্য এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ায় ভারত এখন বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে চাইছে। রাশিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সহযোগিতা সেই কৌশলের অংশ হতে পারে। 

বাণিজ্য বাড়াতে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের চেষ্টা করছে দুই দেশ। পশ্চিমা আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে ভারত ও রাশিয়া নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং দুই দেশের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছে। ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহারও আলোচনায় রয়েছে। 

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও এই বাণিজ্য লক্ষ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর, উত্তর সাগরপথ এবং চেন্নাই-ভ্লাদিভস্তক সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত ও সহজ পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। 

এ ছাড়া ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নকে ঘিরে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও এগিয়ে চলছে। এই ধরনের চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতের ব্যবসায়ীরা রাশিয়াসহ ইউরেশিয়ার বড় বাজারে তুলনামূলক সহজে প্রবেশ করতে পারবেন। রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা ইতোমধ্যে অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। 

তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ঘাটতি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থ লেনদেনের জটিলতা, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাণিজ্য বাধা। দুই দেশ এসব বাধা কমাতে নিয়মনীতি সহজ করা, নতুন পরিবহনপথ তৈরি এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। 

সব মিলিয়ে, রাশিয়া ও ভারতের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; বরং জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা। বর্তমান প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে হলে ভারতকে রাশিয়ায় রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর