ব্রুকলিনে ডে-কেয়ার মালিকের ৭৬ মাসের জেল, ফেরত দিতে হবে ৫৬ মিলিয়ন ডলার

মেডিকেইড জালিয়াতির দায়ে ব্রুকলিনের ডে-কেয়ার মালিক জাকিয়া খানকে ৭৬ মাস কারাদণ্ড, ফেরত ও বাজেয়াপ্ত মিলিয়ে কোটি ডলারের অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ব্রুকলিনে ডে-কেয়ার মালিকের ৭৬ মাসের জেল, ফেরত দিতে হবে ৫৬ মিলিয়ন ডলার

ব্রুকলিনে ডে-কেয়ার মালিকের ৭৬ মাসের জেল, ফেরত দিতে হবে ৫৬ মিলিয়ন ডলার


নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে কোটি কোটি ডলারের মেডিকেইড জালিয়াতি ও অবৈধ ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে দায় স্বীকার করা এক ডে-কেয়ার মালিককে ৭৬ মাস বা ছয় বছর চার মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ফেডারেল আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি জালিয়াতি থেকে পাওয়া আরও ৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নিউইয়র্কের পূর্বাঞ্চলীয় জেলার কার্যালয় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ তথ্য জানায়। ফেডারেল আদালতে বিচারক নাতাশা সি. মার্লে ব্রুকলিনের ৫৫ বছর বয়সী জাকিয়া খানকে এই সাজা দেন। তিনি দুটি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার কেন্দ্র এবং একটি গৃহস্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলারের মেডিকেইড জালিয়াতি ও অবৈধ ঘুষের ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, জাকিয়া খান ব্রুকলিনের কনি আইল্যান্ড এলাকায় হ্যাপি ফ্যামিলি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার কেন্দ্র এবং ফ্যামিলি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার কেন্দ্রের মালিক ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং নামের একটি গৃহস্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তানউই সার্ভিসেস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হয়েছিল জালিয়াতি থেকে পাওয়া অর্থ গ্রহণ ও আড়াল করার কাজে।


ফেডারেল প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, এই কার্যক্রম প্রায় ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত চলেছে। এই সময়ে বিভিন্ন বিপণনকারী ও নিয়োগকারীর মাধ্যমে মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের ওই ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোতে যুক্ত করা হতো। কিন্তু অভিযোগের মূল বিষয় ছিল, অনেক ক্ষেত্রে যে সেবা দেখিয়ে মেডিকেইডের কাছে বিল পাঠানো হয়েছে, সেই সেবা বাস্তবে দেওয়া হয়নি অথবা সুবিধাভোগীদের অবৈধ অর্থ বা ঘুষ দিয়ে ওই সেবার জন্য নথিপত্র তৈরি করা হয়েছিল।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুবিধাভোগীদের ডে-কেয়ার কর্মসূচিতে যুক্ত করার জন্য বিপণনকারীরা নগদ অর্থ বা অন্যান্য অবৈধ সুবিধা দিতেন। এরপর ওই সুবিধাভোগীদের উপস্থিতি দেখিয়ে নথি তৈরি করা হতো এবং সেই নথির ভিত্তিতে মেডিকেইডের কাছে অর্থ দাবি করা হতো। সরকারি নথিতে এমন ভুয়া উপস্থিতির কাগজপত্র তৈরির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।


অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছিল, কিছু ক্ষেত্রে বিপণনকারীরা মেডিকেল মূল্যায়নের সময় সুবিধাভোগীর পরিবারের সদস্য বা পরিচর্যাকারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে উপস্থিত থাকতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা। তদন্তকারীদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেডিকেইডের অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থের পরিমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাকিয়া খানের মালিকানাধীন দুটি ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠান ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া বা প্রতারণামূলক দাবি মেডিকেইডের কাছে জমা দেয়। এর মধ্যে মেডিকেইড থেকে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। এই অর্থই এখন মামলার ক্ষতিপূরণের বড় অংশ হিসেবে ফেরত দেওয়ার নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিভিন্ন পর্যায়ে মামলাটিকে ৬৮ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালে জাকিয়া খান যখন দোষ স্বীকার করেন, তখন বিচার বিভাগ জানিয়েছিল, তিনি প্রায় ৬৮ মিলিয়ন ডলার মেডিকেইড থেকে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়ার ষড়যন্ত্রে দোষ স্বীকার করেছেন। তবে ২০২৬ সালের সাজা ঘোষণার সময় বিচার বিভাগ বিস্তারিতভাবে জানায় যে সংশ্লিষ্ট দুটি ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া দাবি করেছিল এবং মেডিকেইড প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল। তাই প্রতিবেদনে এই দুই সংখ্যার পার্থক্যকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।


জাকিয়া খান ২০২৫ সালের আগস্টে ফেডারেল আদালতে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ষড়যন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতারণা ও অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা-ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্রের দায় স্বীকার করেন। ওই সময় বিচার বিভাগ জানিয়েছিল, তার সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে সম্মত হয়েছিলেন।


তদন্তকারীরা শুধু নগদ অর্থের বিষয়েই থেমে থাকেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ অর্থ, সোনার গয়না এবং দুটি সম্পত্তিসহ বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করেছিল। আদালতের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, জালিয়াতি থেকে পাওয়া প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে। এর বাইরে মেডিকেইডকে ৫৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি ফেরত দেওয়ার আদেশও দেওয়া হয়েছে।

এই মামলার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয় এবং নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মামলাটি স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদন্তের একটি উদাহরণ।

নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জেসিকা এস. টিশ বলেছেন, মেডিকেইডের অর্থ এমন মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত, যাদের এ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘুষ ও অবৈধ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে এই অর্থ নেওয়া শুধু আইনবিরোধী নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও আঘাত।

স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ও বলেছে, সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার এবং গৃহস্বাস্থ্যসেবা মূলত বয়স্ক ও প্রয়োজনীয় সহায়তাপ্রত্যাশী মানুষদের সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি। সরকারি অর্থ ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা হলে তা শুধু করদাতাদের অর্থের ক্ষতি করে না, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য নির্ধারিত সেবার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।


মামলায় জাকিয়া খানের সঙ্গে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে বিচার বিভাগ জানিয়েছিল, তার দুই কর্মী সীমা মেমন ও আমরান হাশমিও মামলায় দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং তাদের সাজা তখনও নির্ধারিত হয়নি। একই মামলায় আরও ১১ জন আসামি বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। অর্থাৎ জাকিয়া খানের সাজা হলেও পুরো মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয়নি।


মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, জালিয়াতির অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘোরানো ও লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে অবৈধভাবে পাওয়া অর্থের প্রবাহ পরিচালনা করা হয় এবং সেখান থেকে বিপণনকারী ও সুবিধাভোগীদের ঘুষ দেওয়ার অর্থ সরবরাহ করা হতো।

এই ঘটনা নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ সব অভিবাসী পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে যারা সামাজিক ডে-কেয়ার, গৃহস্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেইড বা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য সরকারি সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক নথি, প্রকৃত সেবা এবং বৈধ বিলিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সুবিধাভোগীকে নগদ অর্থ দিয়ে সরকারি কর্মসূচিতে যুক্ত করা, ভুয়া উপস্থিতির কাগজে স্বাক্ষর করানো কিংবা দেওয়া হয়নি এমন সেবার জন্য বিল পাঠানো গুরুতর ফেডারেল অপরাধে পরিণত হতে পারে।


তবে এই মামলার ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটি কোনো সাধারণ শিশুদের ডে-কেয়ার বা শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের মামলা নয়। এখানে মূলত বয়স্ক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাভোগীদের জন্য পরিচালিত সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার এবং গৃহস্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি প্রচারের সময় শুধু “ডে-কেয়ার” শব্দ ব্যবহার করে শিশুদের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।


ফ্যাক্ট যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে জাকিয়া খানের ৭৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ এবং ৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্তের তথ্য প্রকাশ করেছে। তিনি এর আগে ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট অপরাধের দায় স্বীকার করেছিলেন। ফলে এটি কেবল অভিযোগের খবর নয়; আদালতে দায় স্বীকারের পর ঘোষিত সাজা।


এই মামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্তৃপক্ষ আবারও স্পষ্ট করেছে যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করলে বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডও হতে পারে। বিশেষ করে মেডিকেইডের মতো সরকারি কর্মসূচির অর্থ ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক লাভের জন্য ভুয়া দাবি, ঘুষ, মিথ্যা নথি বা সাজানো সেবার মাধ্যমে নেওয়ার চেষ্টা করলে তদন্ত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।


তথ্যের উৎস ও যাচাই: যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নিউইয়র্কের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কার্যালয়ের ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং ২০২৫ সালের দায় স্বীকারসংক্রান্ত বিচার বিভাগের নথি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর