ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে দাবি ট্রাম্পের, হরমুজ নিয়েও বড় বার্তা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে বলে দাবি ট্রাম্পের; হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে দাবি ট্রাম্পের, হরমুজ নিয়েও বড় বার্তা

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে দাবি ট্রাম্পের, হরমুজ নিয়েও বড় বার্তা


ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়েও নিজের প্রশাসনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।ট্রাম্প ডালাসের সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তেহরানকে নতুন কোনো সামরিক বা পারমাণবিক তৎপরতা চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেন। ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় তৎপরতা নিয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে সেখানে হামলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। 

তবে ট্রাম্পের ‘যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হচ্ছে’ বক্তব্যকে যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সংঘাত এখনো চলমান এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বরং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে। এটি আগের দশ দিনের গড় চলাচলের প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে সক্ষমতার কথা বললেও বাস্তবে জলপথটি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে উঠে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের বাজারে এই চাপ তৈরির অন্যতম কারণ। 

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর সামরিক অগ্রগতি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুথিরা ইয়েমেনের কৌশলগত মোকা বন্দর শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং লোহিত সাগরের উপকূল ধরে গুরুত্বপূর্ণ হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এর ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

হরমুজ প্রণালির বিপরীত দিকে বাব আল-মান্দাবও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই দুই নৌপথে একই সময়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তেল, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবের মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও যদি সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব এখন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়ছে। ডালাসের রিপাবলিকান সম্মেলনে ট্রাম্প যুদ্ধের পাশাপাশি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে চাইছে। ট্রাম্প আরও বলেছেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। 

রিপাবলিকানদের সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল তাঁর দলের সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করা। তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মকাণ্ডের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে উপস্থাপন করেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ট্রাম্প রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর নিজের জনপ্রিয়তাকে বড় ভূমিকা হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তবে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপরও চাপ পড়ে।

ডালাসের সম্মেলনে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি মার্কিন ভোটারদের জন্য ৫ হাজার ডলারের অর্থপ্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেন। তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকরা এই অর্থ পেতে পারেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, এই পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে এবং এর বাস্তবায়নে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রশ্ন রয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্যের দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত, তেলের দাম বেড়েছে এবং বাব আল-মান্দাবের কাছেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর