শাওমিকে ঘিরে ভারতে তদন্তের সুপারিশ, নয়াদিল্লিকে ন্যায্য পরিবেশের আহ্বান চীনের

শাওমির ভারতীয় ব্যবসা তদন্তের সুপারিশ করল এসএফআইও, চীন ভারতকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ন্যায্য স্বচ্ছ বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানাল।

শাওমিকে ঘিরে ভারতে তদন্তের সুপারিশ, নয়াদিল্লিকে ন্যায্য পরিবেশের আহ্বান চীনের

শাওমিকে ঘিরে ভারতে তদন্তের সুপারিশ, নয়াদিল্লিকে ন্যায্য পরিবেশের আহ্বান চীনের


ভারতে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করেছে দেশটির গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত দপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে সব দেশের প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ন্যায্য, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে চীন।

১০ সেপ্টেম্বর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুনকে শাওমিকে ঘিরে ভারতের তদন্তের সুপারিশ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, বিষয়টির নির্দিষ্ট তথ্য সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা পারস্পরিকভাবে লাভজনক বলে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত দেশটিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনা করা সব দেশের প্রতিষ্ঠানকে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ দেবে।

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত দপ্তর বা এসএফআইওর একটি সুপারিশকে ঘিরে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা একটি সরকারি নথি অনুযায়ী, শাওমির ভারতীয় কার্যক্রমের ব্যবসায়িক কাঠামো এবং বিদেশি বিনিয়োগসংক্রান্ত আইন মেনে চলার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। নথিটি চলতি বছরের মে মাসে তৈরি করা হয়েছিল।

প্রস্তাবিত তদন্তে প্রথমত শাওমির ভারতীয় কার্যক্রমে অর্থের প্রবাহ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। অর্থ কীভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং এসব লেনদেন সংশ্লিষ্ট ভারতীয় আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার প্রস্তাব রয়েছে।

এর পাশাপাশি ২০২০ সালের পর চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত যে অতিরিক্ত সরকারি অনুমোদনের ব্যবস্থা চালু করেছিল, শাওমি সেসব প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। ভারত ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনা বিনিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছিল।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ। এসএফআইওর প্রস্তাবে দেখা হবে, শাওমি বা সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন যথাযথভাবে প্রকাশ ও অনুমোদিত হয়েছিল কি না।

শুধু অর্থের লেনদেন বা মালিকানাই নয়, শাওমির ভারতে অনলাইন ব্যবসার কাঠামোও প্রস্তাবিত তদন্তের আওতায় আসতে পারে। বিশেষ করে অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্টের মতো ই-বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে শাওমির পণ্যের বিশেষ বা একচেটিয়া উদ্বোধন এবং ভারতীয় বিক্রেতা বা বিপণন অংশীদারদের ওপর শাওমির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

এসএফআইওর প্রস্তাবিত কাঠামোতে মোট ২১টি বিষয় নিয়ে তদন্তের কথা রয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরীক্ষা, বর্তমান ও সাবেক পরিচালকদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কোম্পানির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মতো বিষয় রয়েছে। অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও সম্ভাব্য অনিয়ম যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসএফআইওর সুপারিশ মানেই শাওমি অপরাধ করেছে, এমন নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি তদন্তের সুপারিশ। চূড়ান্তভাবে তদন্ত শুরু হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ভারতের করপোরেট বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ বর্তমানে শাওমির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না।

শাওমিও জানিয়েছে, তারা এসএফআইওর কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ বা যোগাযোগ পায়নি। কোম্পানিটির বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ভারতীয় আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং সব সময় দেশটির আইন মেনে চলেছে।

শাওমির জন্য এই ঘটনা অবশ্য নতুন কোনো নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ নয়। এর আগেও ভারতে কোম্পানিটির সম্পদ, অর্থ স্থানান্তর এবং রয়্যালটি সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিরোধ হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২২ সাল থেকে শাওমির প্রায় ৫৮৪ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ব্যাংক সম্পদ আটকে রেখেছে বলে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে আইনি বিরোধে রয়েছে। শাওমি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভারতের স্মার্টফোন বাজারেও শাওমির অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কোম্পানিটির বাজার অংশীদারত্ব কমে প্রায় ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতে শাওমির আয় ছিল প্রায় ২৫২ কোটি ডলার, যা তিন বছর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম।

এই তদন্তের সুপারিশ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারত ও চীন দুই দেশই সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছিল। এরপর চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসার ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রক নজরদারি বাড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে বড় চীনা কোম্পানিগুলোর ভারতীয় বাজারে কার্যক্রম নিয়ে নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রক বিষয়গুলোতে ভারতের সতর্কতা এখনো রয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হলেও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রক বাধা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে।

চীনের সর্বশেষ বক্তব্য সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। শাওমির নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে বলেছে, চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা পারস্পরিক লাভজনক। একই সঙ্গে ভারতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করা সব দেশের কোম্পানির জন্য ন্যায্য, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই ঘটনা শুধু একটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রক জটিলতা নয়; এটি ভারত-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের বৃহত্তর বাস্তবতাও তুলে ধরছে। একদিকে দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে এগোতে চাইছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা, মালিকানা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে পারস্পরিক সন্দেহ পুরোপুরি কাটেনি।

বিশেষ করে ই-বাণিজ্য খাতে শাওমির মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান আইন ভেঙেছে কি না, সেটি নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

ভারতের গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত দপ্তর শাওমির ভারতীয় ব্যবসা নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করেছে—এটি সত্য। চীনও ভারতকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে—এটিও সত্য। তবে শাওমির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বা তদন্ত ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে—এমন দাবি এখনই করা যাবে না।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর