যুক্তরাষ্ট্রে পাইকারি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫.৪ শতাংশ, সুদহার নিয়ে বাড়ছে চাপ

যুক্তরাষ্ট্রে আগস্টে পাইকারি মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ, জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় ফেডের সুদহার সিদ্ধান্তে বাড়ছে নতুন চাপ।

যুক্তরাষ্ট্রে পাইকারি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫.৪ শতাংশ, সুদহার নিয়ে বাড়ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে পাইকারি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫.৪ শতাংশ, সুদহার নিয়ে বাড়ছে চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের পাইকারি পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি আগস্টে প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা বেশি বেড়েছে। নতুন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে উৎপাদক মূল্যসূচক বা পিপিআই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ে এই বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে।

মাসিক হিসাবেও আগস্টে উৎপাদক মূল্যসূচক ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বাজারের অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি। অর্থাৎ প্রকৃত ফলাফল পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য বেশি হয়েছে। বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির এই গতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো পুরোপুরি কমেনি—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আগস্টের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি খাত। মাসটিতে জ্বালানি মূল্য ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পণ্য পরিবহন, উৎপাদন এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচের ওপর পড়েছে। এ কারণে উৎপাদকদের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ভোক্তা পর্যায়ের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে পণ্যের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সেবার দাম বেড়েছে ০ দশমিক ১ শতাংশ। খাদ্যের দামও সামান্য বেড়েছে। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সামগ্রিক উৎপাদক পর্যায়ে এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দিয়েও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মূল উৎপাদক মূল্যসূচক বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আগস্টের সামগ্রিক পিপিআই বৃদ্ধির বড় কারণ হলেও মূল্যচাপের কিছু অংশ অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফেড দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশের মধ্যে রাখতে চায়। কিন্তু উৎপাদক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পিপিআই সরাসরি ভোক্তা মূল্যস্ফীতির সূচক নয়। এটি মূলত উৎপাদকরা তাদের পণ্য ও সেবার জন্য যে দাম পান, সেই দামের পরিবর্তন পরিমাপ করে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বোঝার ক্ষেত্রে ভোক্তা মূল্যসূচক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিপিআই ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়া মানেই সাধারণ ভোক্তার পণ্যের দাম একই হারে বাড়ছে—এমনটা বলা যাবে না।

তবু পিপিআই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উৎপাদক পর্যায়ে ব্যয় বাড়লে ব্যবসাগুলো পরবর্তী সময়ে সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়লে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যও বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

আগস্টের তথ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেল ও জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক মূল্য এবং পরবর্তী সময়ে ভোক্তা মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে আগস্টের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি খাতের শক্তিশালী ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

এখন সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী নীতিনির্ধারণী বৈঠকের দিকে। সেপ্টেম্বরের বৈঠক ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘সেপ্টেম্বরে সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানোর সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ’ তথ্যটি সরাসরি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না। বাজারভিত্তিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, পিপিআই প্রকাশের আগে এই সম্ভাবনা প্রায় ৬২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা প্রায় ৬৪ শতাংশে উঠেছে বলে বাজার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৭০ শতাংশের দাবিটি অতিরঞ্জিত বা অন্য সময়ের বাজার-তথ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফেডের সিদ্ধান্ত শুধু পিপিআইয়ের ওপর নির্ভর করবে না। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, মজুরি বৃদ্ধি, ভোক্তা ব্যয় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হবে। বিশেষ করে ভোক্তা মূল্যসূচকের নতুন তথ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার বাড়লে সাধারণত ঋণের খরচ বাড়তে পারে। বাড়ির ঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং বিভিন্ন ধরনের ভোক্তা ঋণের সুদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে খাবার, পরিবহন, বাসাভাড়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচের ওপরও চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

তবে সুদের হার বাড়বে কি না, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আগস্টের পিপিআই মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দিয়েছে, কিন্তু ফেডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও অর্থনৈতিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে আগস্টের পাইকারি মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর খবরটি সত্য এবং এটি জুলাইয়ের ৪ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জ্বালানি মূল্য ৪ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ায় এই বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ—এই দাবিটি নিশ্চিত নয় এবং প্রকাশিত বাজার-তথ্য অনুযায়ী সেটি প্রায় ৬২–৬৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…