যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই ইরানের পাশে রাশিয়া, বাড়ছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই ইরানের পাশে রাশিয়া, জ্বালানি বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন সমঝোতায় আরও ঘনিষ্ঠ দুই দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই ইরানের পাশে রাশিয়া, বাড়ছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই ইরানের পাশে রাশিয়া, বাড়ছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে মস্কো। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের বাস্তবায়ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে, তখন রাশিয়া ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে সামনে এসেছে।


১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বৈঠক হয়। ক্রেমলিনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতা দুই দেশের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।

এই সম্পর্কের ভিত্তি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তিটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পরিবহন, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বহু ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের অন্যতম প্রধান কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।


বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান খাতকে লক্ষ্য করে ৩৬টি নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর আওতায় ইরানের বিমান সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী, কার্গো ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠানও এসেছে।


ওয়াশিংটনের লক্ষ্য শুধু সামরিক সক্ষমতা কমানো নয়; ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ও নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটিতে মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেড়েছে।


এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইরানের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। দুই দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ফলে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা, স্থল ও সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং জ্বালানি সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্র দুই দেশের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


জ্বালানি খাতও এই সম্পর্কের অন্যতম বড় ভিত্তি। রাশিয়া ও ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশ। কিন্তু দুই দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে নিজেদের জ্বালানি সম্পদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে বাধার মুখে পড়ে। ফলে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, পরিবহন ও বিকল্প বাজার তৈরির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্য। রাশিয়া মধ্য এশিয়া ও কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। অন্যদিকে ইরান রাশিয়াকে পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে বাণিজ্যিক প্রবেশপথ দিতে পারে। ফলে দুই দেশের সহযোগিতা শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইউরেশিয়ার বৃহত্তর বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ইরানের জন্য আরেকটি সুবিধা হলো কূটনৈতিক সমর্থন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া স্থায়ী সদস্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মস্কোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চাপের মুখে তেহরান তাই মস্কোর সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়কে কৌশলগতভাবে মূল্য দেয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু প্রতিবেদনে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে নতুন শত শত কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি বা নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির দাবি করা হচ্ছে। এসব দাবির সবকটির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। তাই সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।

বরং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত এবং ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ার পর এর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।


রাশিয়া অবশ্য এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে সেনা পাঠানোর মতো পদক্ষেপ নেয়নি। মস্কোর নীতি অনেকটাই কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকেন্দ্রিক। একই সঙ্গে রাশিয়া নিজের স্বার্থও বিবেচনা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া নিজেও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। ফলে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো মস্কোর জন্য পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর যত বেশি অর্থনৈতিক চাপ দিচ্ছে, তত বেশি তেহরান রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য অ-পশ্চিমা অংশীদারের দিকে ঝুঁকছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।


এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত এবং তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম যে বেড়েছে, তা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সহজে কমবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিস্থিতি জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।


রাশিয়া–ইরান ঘনিষ্ঠতা এখন শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।

তবে “রাশিয়া ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক জোট গড়ে ফেলেছে”—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনও আসেনি। বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে রাশিয়া ও ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের আরও গভীর হওয়া এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর