ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা চাইলেন তিন সন্তান হত্যায় অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির আইনজীবী

তিন সন্তান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির আইনজীবী এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ক্ষমার আবেদন জানিয়েছেন। মামলায় জুরি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় নতুন করে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য ও আলোচনা।

ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা চাইলেন তিন সন্তান হত্যায় অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির আইনজীবী

ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা চাইলেন তিন সন্তান হত্যায় অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির আইনজীবী


যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে তিন সন্তান হত্যার অভিযোগে আলোচিত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলায় নতুন মোড় এসেছে। মামলার প্রথম বিচারপর্বে জুরি সদস্যরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় বিচারক মিসট্রায়াল ঘোষণা করার পর এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ক্ল্যান্সিকে ক্ষমা করার আবেদন জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী কেভিন রেডিংটন।

মঙ্গলবার সকালে একটি জনপ্রিয় মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেডিংটন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, লিন্ডসে ক্ল্যান্সি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন এবং তাঁর মানসিক অবস্থার বিষয়টি যেন মানবিকভাবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ট্রাম্পের কাছে ক্ল্যান্সিকে ক্ষমা করার বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

তবে এই আবেদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের অপরাধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাধারণত ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধে ক্ষমা প্রদানের সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখেন। তাই ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের এই মামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ক্ষমা ঘোষণা করতে পারবেন কি না—সেটিই বড় আইনি প্রশ্ন।

লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ম্যাসাচুসেটসের ডাক্সবারিতে নিজের বাড়িতে তিনি তাঁর তিন সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। নিহত শিশুদের মধ্যে ছিল পাঁচ বছর বয়সী কোরার, তিন বছর বয়সী ডসন এবং মাত্র আট মাস বয়সী ক্যালান। সন্তানদের মৃত্যুর পর ক্ল্যান্সি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাড়ির জানালা থেকে পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং বর্তমানে গুরুতর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন।

ক্ল্যান্সি নিজেকে অপরাধের জন্য দায়ী মনে করেন না। তাঁর আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, সন্তানদের মৃত্যুর সময় তিনি প্রসব-পরবর্তী গুরুতর মানসিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁদের দাবি, প্রসবের পর তৈরি হওয়া মানসিক বিকার বা প্রসব-পরবর্তী মানসিক রোগের কারণে ক্ল্যান্সি তখন বাস্তবতা বোঝার এবং নিজের কর্মকাণ্ডের পরিণতি উপলব্ধি করার স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে অপরাধের জন্য আইনগতভাবে দায়ী করা উচিত নয় বলে প্রতিরক্ষা পক্ষের দাবি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ছিল, ক্ল্যান্সি তাঁর সন্তানদের হত্যার সময় নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তাঁকে আইনের আওতায় দায়ী করা উচিত। এই বিষয়টি নিয়েই বিচার চলাকালে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র আইনি লড়াই হয়। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্কের পর মামলাটি জুরি সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।

জুরি সদস্যরা প্রায় ৩৮ ঘণ্টা ধরে সাত দিন আলোচনা করেও শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি মামলায় নির্দিষ্ট অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করতে জুরি সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সেই ঐকমত্য না হওয়ায় বিচারক মামলাটিকে মিসট্রায়াল ঘোষণা করেন। এর অর্থ ক্ল্যান্সি খালাস পেয়েছেন এমন নয়; একইভাবে তাঁকে দোষীও ঘোষণা করা হয়নি। ফলে মামলাটি এখনো আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

মিসট্রায়ালের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ক্ল্যান্সির মামলার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তিনি ঘটনাটি অনুসরণ করেছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন। তবে তিনি ক্ল্যান্সিকে ক্ষমা করার কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি বা মামলায় হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত জানাননি।

এদিকে লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শুনানি আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ তাঁকে আবার বিচারের মুখোমুখি করবে কি না, কোনো সমঝোতার চেষ্টা করবে কি না, অথবা মামলাটি অন্য কোনোভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে কি না—তা স্পষ্ট হতে পারে। ক্ল্যান্সির আইনজীবীও মামলাটি বাতিলের আবেদন করার কথা ভাবছেন এবং প্রয়োজনে সমঝোতার পথ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য এবং গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে একজন ব্যক্তি অপরাধের জন্য কতটা আইনগতভাবে দায়ী তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। প্রতিরক্ষা পক্ষ যেখানে তাঁর মানসিক অবস্থাকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে রাষ্ট্রপক্ষ অপরাধের ভয়াবহতা ও আইনগত দায়ের বিষয়টিকে সামনে রাখছে।

জুরি সদস্যদের ঐকমত্য না হওয়ায় লিন্ডসে ক্ল্যান্সির প্রথম বিচারপর্ব শেষ হলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তাঁর আইনজীবীর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ক্ষমার আবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে যেহেতু মামলাটি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের, তাই ট্রাম্পের হাতে সরাসরি এই মামলায় ক্ষমা দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে মামলাটির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর