ধ্বংসস্তূপে ১০ দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার চীনা নাগরিক
ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ১০ দিন! মৃত্যুকে হারিয়ে অবশেষে জীবিত উদ্ধার চীনা নাগরিক লু হাইতাও। ভয়াবহ দুর্যোগের মাঝেও তাঁর বেঁচে থাকা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
ধ্বংসস্তূপে ১০ দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার চীনা নাগরিক
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা প্রায় ১০ দিন আটকে থাকার পর অবশেষে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন চীনা নাগরিক লু হাইতাও। ৫ সেপ্টেম্বর নেপালের রাশুয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ভয়াবহ দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় তাঁর এই জীবিত উদ্ধার নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে।
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, লু হাইতাওকে সুড়ঙ্গের প্রায় ২২৫ মিটার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। নেপালি সেনা ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে সুড়ঙ্গের কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছায়। উদ্ধারের পর তাঁকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয় এবং পরে হেলিকপ্টারে করে সেনাবাহিনীর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উদ্ধারের সময় লু হাইতাওকে অত্যন্ত ক্লান্ত ও দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়। তাঁর শরীর ও পোশাকে শুকনো কাদা ও ধুলোর স্তর ছিল। চিকিৎসকদের প্রাথমিক মূল্যায়নে তাঁর দৃশ্যমান গুরুতর কোনো আঘাত পাওয়া যায়নি এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। তবে দীর্ঘ সময় ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে আটকে থাকার কারণে তাঁর শরীরে হালকা হাইপোথার্মিয়ার লক্ষণ দেখা যায়।
পরে লু হাইতাও উদ্ধারকারীদের জানান, তিনি সুড়ঙ্গের অন্ধকারে আটকে থাকার সময় উদ্ধারকারীদের উপস্থিতি টের পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি উদ্ধারকারীদের বাঁশি ও শব্দ শুনেছিলেন বলেও জানান। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার কারণে একপর্যায়ে তিনি মনে করেছিলেন, হয়তো এসব শব্দ তাঁর কল্পনা মাত্র। উদ্ধারকারীরা যখন তাঁর সামনে আলো ফেলেন, তখন তিনি প্রায় বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে সত্যিই তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেছে।
লু হাইতাও চীনের হেনান প্রদেশের বাসিন্দা এবং তাঁর বয়স ৪৯ বছর বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কাজের সন্ধানে নেপালে যান। বন্যার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা কয়েক দিন তাঁর কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা স্বস্তি প্রকাশ করেন। এমনকি উদ্ধার হওয়ার ছবি প্রকাশের আগ পর্যন্ত তাঁর পরিবারও বিশ্বাস করতে পারছিল না যে তিনি সত্যিই বেঁচে আছেন।
লু হাইতাও ছিলেন ত্রিশূলী নদী অববাহিকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া তৃতীয় ব্যক্তি। এর এক দিন আগে, ৪ সেপ্টেম্বর আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আরেকটি সুড়ঙ্গ থেকে নেপালের দুই কর্মী সঞ্জয় শাহ ও কবির মহারাজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাঁরা প্রায় নয় দিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন।
সঞ্জয় শাহ ও কবির মহারাজনকে উদ্ধারের ঘটনাও ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। তাঁরা সুড়ঙ্গের ভেতরে একটি ছোট বায়ুথলির মতো জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে সীমিত বাতাসের মধ্যে তাঁরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করেন। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে বাইরে নিয়ে আসেন। তাঁদের একজনকে পিঠে করে এবং অন্যজনকে স্ট্রেচারে করে সুড়ঙ্গ থেকে বের করা হয়। কবির মহারাজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এই তিনজনের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন নেপালের ত্রিশূলী নদী ও আশপাশের অঞ্চল ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চভূমিতে হিমবাহ ভেঙে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে নদী উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয় এবং বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই দুর্যোগে নেপালের রাশুয়া, নুওয়াকোটসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অনেক সুড়ঙ্গ কাদা, পানি ও পাথরে বন্ধ হয়ে যায়। এসব প্রকল্পে কর্মরত বহু শ্রমিক ও কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
নেপালি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশটির বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ কর্মী নিখোঁজ হয়ে যান বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে। ফলে লু হাইতাও এবং অন্য দুই কর্মীর জীবিত উদ্ধার হওয়ার পর নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ থাকতে পারেন।
তবে দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যাও ভয়াবহ। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বলে জানানো হয়। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাতে ১ হাজার ৩৪৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সরকারি আপডেটে পরিবর্তন দেখা গেছে, তাই সর্বশেষ সংখ্যা নির্ধারণে সময়ভেদে পার্থক্য রয়েছে।
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অংশও এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেখানে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু এবং শত শত মানুষের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় ধ্বংসস্তূপ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার অভিযানও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাদায় ভরা ও পানিতে প্লাবিত সুড়ঙ্গগুলোতে প্রবেশ করা। কোথাও ধ্বংসস্তূপ এতটাই জমেছে যে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি, ভেজা মাটি এবং নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এর মধ্যেই লু হাইতাওয়ের জীবিত উদ্ধার নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১০ দিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পরও একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারেন—এই ঘটনা উদ্ধারকারী দল ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠেছে।
তাই লু হাইতাওয়ের উদ্ধার শুধু একজন মানুষের জীবন ফিরে পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে এখনও নিখোঁজ থাকা শত শত মানুষের স্বজনদের জন্যও আশার প্রতীক। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় কর্তৃপক্ষ এখন আরও সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসস্তূপে জীবিত মানুষের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।