ডেনমার্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে, তবে ভিসা ও খরচে সতর্কতা জরুরি

উন্নত জীবনযাত্রা ও মানসম্মত শিক্ষার টানে ডেনমার্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনায় ইউরোপে বাড়ছে জনপ্রিয়তা।

ডেনমার্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে, তবে ভিসা ও খরচে সতর্কতা জরুরি

ডেনমার্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে, তবে ভিসা ও খরচে সতর্কতা জরুরি


উন্নত জীবনযাত্রা, নিরাপদ পরিবেশ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষায় উচ্চশিক্ষার সুযোগের কারণে ইউরোপের দেশ ডেনমার্ক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ থেকেও ইউরোপে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেনমার্ককে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেক শিক্ষার্থী। তবে দেশটিতে পড়াশোনার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু নিয়ম কঠোর হয়েছে। ফলে ভর্তি, অর্থের সংস্থান এবং আবাসিক অনুমতির বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ডেনমার্কের সরকারি উচ্চশিক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ইংরেজি-মাধ্যমের শিক্ষাক্রম রয়েছে।

 বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে ডেনমার্কের ইংরেজি-মাধ্যমের উচ্চশিক্ষা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক আগ্রহও উল্লেখযোগ্য ছিল। সরকারি প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, চলতি বছরে ডেনমার্কে উচ্চশিক্ষার জন্য বিপুলসংখ্যক অ-ড্যানিশ নাগরিক আবেদন করেছেন।

ডেনমার্কের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যবহারিক জ্ঞান ও গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইনির্ভর জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, স্বাধীন চিন্তা এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়। এ কারণে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, পরিবেশ ও ব্যবসাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইংরেজি-মাধ্যমের শিক্ষাক্রম। ডেনমার্কের সরকারি শিক্ষা পোর্টালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ইংরেজি ভাষার কোর্স ও ডিগ্রি কর্মসূচির তথ্য দেওয়া রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কোর্সে ইংরেজি ভাষার দক্ষতার কী প্রমাণ প্রয়োজন, তা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাক্রমভেদে আলাদা হতে পারে। তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শর্ত যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ডেনমার্কে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো খরচ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার বাইরের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ডিগ্রি পর্যায়ে টিউশন ফি প্রযোজ্য। ডেনমার্কের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণকালীন ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের বার্ষিক টিউশন ফি সাধারণভাবে প্রায় ৬ হাজার থেকে ১৬ হাজার ইউরোর মধ্যে হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে দাঁড়ায়। তবে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় অনুযায়ী ফি কমবেশি হতে পারে।

শুধু টিউশন ফি নয়, জীবনযাত্রার খরচও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বিবেচনার বিষয়। বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বইপত্র, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যক্তিগত খরচ—সব মিলিয়ে ডেনমার্কে পড়াশোনার মোট ব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে রাজধানী কোপেনহেগেনের মতো শহরে আবাসন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ডেনমার্কের সরকারি শিক্ষা পোর্টালও শিক্ষার্থীদের দেশটিতে যাওয়ার আগে ব্যাংক, বাজেট, বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যয়ের বিষয়ে পরিকল্পনা করতে পরামর্শ দেয়।

তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ডেনমার্কের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সুইজারল্যান্ডের বাইরের শিক্ষার্থীরা সাধারণভাবে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন এবং জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে পূর্ণকালীন কাজ করার সুযোগ থাকে। এজন্য প্রয়োজনীয় কাজের অনুমতি থাকতে হয়।

এই কাজের সুযোগ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খরচের একটি অংশ সামলাতে সাহায্য করতে পারে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মপরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। তবে শুধু খণ্ডকালীন কাজের আয়ের ওপর নির্ভর করে ডেনমার্কে পড়াশোনার পুরো খরচ চালানোর পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আগে থেকেই হিসাব করে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

পড়াশোনা শেষ করার পরও কিছু শিক্ষার্থীর জন্য ডেনমার্কে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি খোঁজার জন্য আবাসিক অনুমতির সুযোগ পেতে পারেন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরি খোঁজার সময়েও নির্দিষ্ট কাজের অধিকার রয়েছে।

তবে এখানেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। ডেনমার্ক সাম্প্রতিক সময়ে অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রকৃত শিক্ষাগত উদ্দেশ্য যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত নয় এমন কিছু উচ্চশিক্ষা কর্মসূচিতে তৃতীয় দেশের শিক্ষার্থীদের আবাসিক অনুমতি সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে। ডেনমার্কের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো যাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য পড়াশোনা করা, তাঁদেরই শিক্ষার্থী হিসেবে আবাসিক অনুমতি দেওয়া।

২০২৬ সালেও ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নীতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির কঠোরতর অভিবাসন ও শিক্ষার্থী-সংক্রান্ত নীতির প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা গেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নতুন নীতির কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাই বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্কে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে তাঁরা কোন বিষয়ে পড়তে চান এবং তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট কোর্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-শর্ত, ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা, টিউশন ফি, আবেদনের সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করতে হবে।

বৃত্তিও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। ডেনমার্কের সরকারি শিক্ষা পোর্টাল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন জাতীয় ও ইউরোপীয় বৃত্তি কর্মসূচি রয়েছে। তবে সব বৃত্তি সব শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাক্রম, নাগরিকত্ব এবং অন্যান্য যোগ্যতার ওপর বৃত্তির সুযোগ নির্ভর করতে পারে।

এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কোনো বেসরকারি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রচার দেখে সরাসরি অর্থ প্রদান না করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডেনমার্ক সরকারের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে ‘শতভাগ ভিসা নিশ্চিত’, ‘কম খরচে ডেনমার্কে যাওয়া’ কিংবা ‘পড়াশোনার পাশাপাশি সহজেই পুরো খরচ উঠে যাবে’—এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

ডেনমার্কের সরকারি শিক্ষা পোর্টাল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২৬ সালের নতুন জীবনযাপন নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে। সেখানে আবাসন, অর্থব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ছাত্রজীবন এবং কাজের মতো বিষয় সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ডেনমার্ক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ পেশাগত অভিজ্ঞতার একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এটিকে সহজে ইউরোপে যাওয়ার পথ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভর্তি যোগ্যতা, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য এবং আবাসিক অনুমতির নিয়ম—প্রতিটি বিষয় আগে যাচাই করা প্রয়োজন।

সঠিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনা এবং সত্য তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করলে ডেনমার্কে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। আর নিয়ম না জেনে বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করলে একই যাত্রা হয়ে উঠতে পারে জটিল ও ব্যয়বহুল।

তাই ডেনমার্কে পড়াশোনার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—প্রথমে সরকারি তথ্য যাচাই করা, এরপর পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচন করা এবং সবশেষে আবাসিক অনুমতির আবেদন করা। ডেনমার্কের সরকারি পোর্টালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবেদন ও উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর