মেক্সিকোতে থাকছেন কিছু মার্কিন নাগরিক, লারেডোতে ট্রাম্পকে নিয়ে বাড়ছে হতাশা
খরচের চাপে লারেডোর কিছু মার্কিন নাগরিক মেক্সিকোতে বসবাস করে প্রতিদিন কাজে ফিরছেন, ট্রাম্পের নীতিতে বাড়ছে হতাশা ও রাজনৈতিক অনুশোচনা।
মেক্সিকোতে থাকছেন কিছু মার্কিন নাগরিক, লারেডোতে ট্রাম্পকে নিয়ে বাড়ছে হতাশা
টেক্সাসের সীমান্ত শহর লারেডোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, অভিবাসননীতি ও রাজনীতির একটি অস্বাভাবিক চিত্র সামনে এসেছে। দ্য টেলিগ্রাফ–এর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লারেডোর কিছু মার্কিন নাগরিক মেক্সিকোর নুয়েভো লারেডোতে বসবাস করে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে আসছেন। অর্থাৎ, তারা মেক্সিকোতে তুলনামূলক কম খরচে থাকছেন, কিন্তু চাকরি বা উপার্জনের জন্য প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে লারেডোতে ফিরছেন।
লারেডো ও নুয়েভো লারেডো রিও গ্রান্ডে নদীর দুই পাশে অবস্থিত। দুই শহরের মধ্যে বহু বছর ধরেই মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সীমান্তের ওপারে বসবাস করে এপারে কাজ করা একেবারে নতুন বিষয় নয়; তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উপায় হিসেবে এই ব্যবস্থা কিছু মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে লারেডোর কয়েকজন বাসিন্দার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ মেক্সিকোতে পরিবারের সঙ্গে থাকছেন, আবার কেউ মেক্সিকোতে তুলনামূলক সস্তা বাসস্থান বেছে নিয়ে প্রতিদিন লারেডোতে কাজ করতে আসছেন। মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভাড়া, দৈনন্দিন খরচ এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয়।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য লারেডোর অর্থনৈতিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সীমান্ত বাণিজ্য, পরিবহন, গুদাম, লজিস্টিকস, খুচরা ব্যবসা ও বিভিন্ন পরিষেবা খাতের ওপর স্থানীয় অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লারেডোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হয়েছে। টেক্সাস ট্রিবিউন এপ্রিল ২০২৬-এ জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত লারেডো মেট্রো এলাকার জনসংখ্যা মাত্র ০.২ শতাংশ বেড়েছে; তার আগের এক বছরে বৃদ্ধি ছিল ৩.২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন কমে যাওয়াকে এই ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসননীতি স্থানীয় অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লারেডোর ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, আইসিইর কর্মস্থল অভিযান ও গ্রেপ্তার নিয়ে আতঙ্কের কারণে কিছু কর্মী কর্মস্থলে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এর ফলে বিশেষ করে নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকট, প্রকল্প বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে।
নির্মাণ খাতের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং নির্মাণ ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এগুলো স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য; এগুলোকে পুরো লারেডোর অর্থনীতির সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
অন্যদিকে লারেডোর অর্থনীতি শুধু অভিবাসনের ওপর নির্ভরশীল নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শহরটির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোর একটি। ২০২৪ সালে লারেডো বন্দর দিয়ে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাণিজ্য টেক্সাসজুড়ে বিপুল সংখ্যক চাকরির সঙ্গে যুক্ত।
তাই সীমান্তে মানুষের চলাচল, অভিবাসননীতি কিংবা বাণিজ্যনীতিতে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব লারেডোর স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়তে পারে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নেতারা বলেছেন, বাণিজ্য এখনো বন্ধ হয়নি, কিন্তু ভবিষ্যৎ নীতির অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও লারেডোর পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শহরটি ওয়েব কাউন্টিতে অবস্থিত, যে কাউন্টি দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে অল্প ব্যবধানে জয় পান।
সরকারি ফলাফলের স্থানীয় প্রতিবেদনে দেখা যায়, ট্রাম্প-ভ্যান্স জুটি ওয়েব কাউন্টিতে ৩৩,৩৮৩ ভোট বা ৫০.৬২ শতাংশ পেয়েছিল। কমালা হ্যারিস-টিম ওয়ালজ পেয়েছিলেন ৩১,৯৫৮ ভোট বা ৪৮.৪৬ শতাংশ।
এই ফলাফল ঐতিহাসিক। ওয়েব কাউন্টি ১৯১২ সালের পর প্রথমবারের মতো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে সমর্থন করে। ফলে দক্ষিণ টেক্সাসের হিস্পানিক ভোটারদের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে লারেডো।