ইরানের ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আনতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে তেহরান–ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক উত্তেজনা
ইরানের একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত।
ইরানের ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আনতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে তেহরান–ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক উত্তেজনা
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই ইরানের একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর দেওয়া তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজার ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা—সবকিছু একসঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী ওয়াশিংটন ইরানের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ প্রয়োগের পথে এগোচ্ছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ব্যাংকিং খাতের কথা সামনে আসা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো দেশের ব্যাংকের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সরাসরি আন্তর্জাতিক লেনদেনই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকি এড়াতে ওই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংককে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ বৃহত্তর আর্থিক নেটওয়ার্কে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে শুধু একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ইরানের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, তেল বাণিজ্য, আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ের নতুন পদক্ষেপগুলো সেই চাপকে আরও বিস্তৃত করার অংশ বলে মনে হচ্ছে। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করতে আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে।
ইরানের জন্য ব্যাংকিং খাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য আমদানি, রপ্তানি, অর্থ স্থানান্তর, বীমা, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির পেমেন্ট—সবকিছুর সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থা জড়িত। কোনো ব্যাংক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈধ লেনদেন চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের জন্য খরচ বাড়তে পারে এবং বিকল্প আর্থিক পথ খুঁজতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এমন চাপকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছে। তেহরান এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে এবং ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে অবৈধ ও চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটি চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। একই সঙ্গে দেশটি তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
নতুন ব্যাংক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা হলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তাদেরও নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হতে পারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে। নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই সতর্কতা আরও বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে জ্বালানি বাজারের সম্পর্কও রয়েছে। ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশগুলোর একটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন হলে তেলের বাজারেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে।
মার্কিন অর্থনীতির ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বাড়লে তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরে পণ্য ও সেবার মূল্যেও পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ইরানের একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের চলমান সংঘাতকে অর্থনৈতিক পর্যায়ে আরও তীব্র করতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর হওয়ার সময় এবং কী ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিস্তারিত চিত্র পরিষ্কার হবে না। ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ তেহরানের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবস্থান—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।