সাইবার যুদ্ধে নতুন নীতি: বেসরকারি কোম্পানিকে হ্যাকিংয়ের ছাড় ট্রাম্পের

ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অপরাধী হ্যাকারদের বিরুদ্ধে নিজেরাই সাইবার হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে র‍্যানসমওয়্যারসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা সহজ হবে। তবে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই নীতি সাইবার জগতে বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত তৈরি করতে পারে

PostImage

সাইবার যুদ্ধে নতুন নীতি: বেসরকারি কোম্পানিকে হ্যাকিংয়ের ছাড় ট্রাম্পের


ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অপরাধী হ্যাকারদের বিরুদ্ধে নিজেরাই সাইবার হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে র‍্যানসমওয়্যারসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা সহজ হবে। তবে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই নীতি সাইবার জগতে বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত তৈরি করতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে একটি জাতীয় নিরাপত্তা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। এর আওতায় নির্বাচিত কিছু মার্কিন কোম্পানি বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হ্যাকিং অভিযান চালাতে পারবে।

এই হামলার মাধ্যমে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোকে নজরদারির পাশাপাশি তাদের সিস্টেম ও নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ, তথ্য পরিবর্তন, অকার্যকর করা কিংবা ধ্বংস করার মতো নির্দিষ্ট ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব হবে। এসব সাইবার কার্যক্রম ভার্চুয়াল ও ভৌত অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করতে পারবে।

তবে এখনো স্পষ্ট নয়, কোন কোন কোম্পানি এই কর্মসূচিতে অংশ নেবে।

এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের প্রচলিত সাইবার নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন। এতদিন মার্কিন প্রশাসনগুলো সাধারণত কোম্পানিগুলোকে নিজেদের সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে এবং আক্রমণাত্মক সাইবার অভিযান মূলত সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে।

বেসরকারি খাতকে সরাসরি আক্রমণাত্মক সাইবার অভিযানে যুক্ত করার ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশাসন প্রকাশ্যে এমন নীতির অনুমোদন দেয়নি। কারণ এতে সাইবার সংঘাত বাড়তে পারে, মার্কিন কোম্পানিগুলোর আইনি দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নতুন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

নতুন স্মারকে এসব ঝুঁকির অনেকগুলো বিষয়ে সরাসরি বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, সাইবার হামলার ক্রমবর্ধমান খরচ মোকাবিলায় “বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী সক্ষমতা” কাজে লাগানোই এই নীতির উদ্দেশ্য।

তবে এটি পুরোপুরি ‘ফ্রি-ফর-অল’ নয়

নীতিটি অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলোকে প্রথমে সরকারি যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপর তাদের সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, যেখানে নিয়ম ভঙ্গ করলে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকবে।

কোনো সাইবার হামলা চালানোর আগে বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে লিখিত অনুমোদন নিতে হবে।

এ ছাড়া এমন কোনো হামলার অনুমতি দেওয়া হবে না, যার ফলে মানুষের মৃত্যু, গুরুতর আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সেটি ‘বলপ্রয়োগ’ বা ‘সশস্ত্র হামলা’র পর্যায়ে পড়ে।

তবে সাবেক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সাইবার অভিযান ঠিক কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তা নির্ধারণ করা অনেক সময় অত্যন্ত জটিল। বাস্তবে একটি সাইবার হামলার প্রভাব পূর্বানুমান করা সবসময় সম্ভব নয়।

হোয়াইট হাউস স্মারকটি নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। শুধু জানিয়েছে, অভিযানগুলো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাইবারনীতি পরিচালক আমান্ডা নায়লার, যিনি স্মারকটি তৈরিতে যুক্ত ছিলেন, LinkedIn-এ বলেছেন, এই নীতি সাইবার অপরাধ ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে আমেরিকানদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কিছু হাতিয়ার দেবে।

বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগ—ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা নির্বাহী নতুন নীতিটি বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, অনুমোদিত বেসরকারি কোম্পানিগুলো এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা কখনো কখনো সরকারের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আইনগত ক্ষমতার সীমাও অতিক্রম করতে পারে।

ট্রাম্পের নির্বাহী পদক্ষেপের সঙ্গে একটি গোপন সংযোজনী রয়েছে। সেখানে বেসরকারি কোম্পানির হ্যাকিং অভিযান এবং মার্কিন সরকারের নিজস্ব সাইবার অভিযান যাতে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়ায়, সে বিষয়ে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্মারক অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় অপরাধী সংগঠন। তবে কোনো অপরাধী গোষ্ঠী সরাসরি কোনো বিদেশি সরকারের অংশ বা তার হয়ে কাজ করছে—এমন পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য থাকলে সেটি এই নীতির আওতায় পড়বে না।

মাইক্রোসফটের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান নিক কারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সাইবার অপরাধীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা। তার মতে, অপরাধী হামলার উৎস নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন এবং খুব কম প্রতিষ্ঠানই এটি ধারাবাহিকভাবে সঠিকভাবে করতে পারে—এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষেও কাজটি সহজ নয়।

অপরাধী হ্যাকার নাকি কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থা?

আরেকটি বড় সমস্যা হলো—কোনো হ্যাকার গোষ্ঠীকে শুধু অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবে তাদের কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে রুশভাষী সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কথা বলা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অর্থের বিনিময়ে অপরাধ চালালেও একই সঙ্গে কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হয়েও কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থার (CISA) সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল গার্সিয়া বলেছেন, অপরাধী সাইবার হামলার উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতা আগের তুলনায় উন্নত হলেও তা এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়। কারণ হামলাকারীরা নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান গোপন করতে নানা কৌশল ব্যবহার করে।

সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ কমাতেই কি নতুন নীতি?

কিছু সাবেক কর্মকর্তা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যার মোকাবিলা করতে চাইছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের কারণে সামনে আরও বড় হতে পারে।

বাইডেন প্রশাসনের সময় সামরিক সাইবার অস্ত্র ব্যবহারের তদারকির সঙ্গে যুক্ত সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মিকে ইয়োয়াং বলেছেন, বর্তমান গতিতে সাইবার অভিযান পরিচালনার পুরো চাপ শুধু সামরিক বাহিনীর ওপর রাখা টেকসই নয়।

তার মতে, নতুন নীতির সফলতা নির্ভর করবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে কীভাবে যাচাই করা হবে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অনুমোদন দেওয়া হবে—সে বিষয়ে গোপন প্রক্রিয়ার ওপর।

চীন ও রাশিয়ার মডেলের কাছাকাছি যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—এটি যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রধান সাইবার প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

এই দেশগুলোতে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতের চুক্তিভিত্তিক হ্যাকারদের জাতীয় নিরাপত্তা অভিযানে ব্যবহার করে আসছে। এর একটি সুবিধা হলো, প্রয়োজন হলে রাষ্ট্র সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও NSA ও U.S. Cyber Command-কে সহায়তা করে। তবে এতদিন তাদের ভূমিকা মূলত হ্যাকিং টুল, সাইবার গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; সরাসরি সাইবার হামলা চালানো তাদের দায়িত্ব ছিল না।

চীনের সাইবার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাকারী বিশেষজ্ঞ ডাকোটা ক্যারি বলেছেন, অতীতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি যেন উল্টো দিকে যাচ্ছে।

তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের মতো বেসরকারি খাতের হ্যাকারদের রাষ্ট্রীয় কাজে যুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী।

কোম্পানিগুলোর জন্যও বড় ঝুঁকি

এই কর্মসূচিতে কোন কোম্পানি অংশ নেবে, সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়। আইনজীবীদের মতে, এতে অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলোর জন্য যথেষ্ট ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ল্যাথাম অ্যান্ড ওয়াটকিনসের অংশীদার ভ্যানেসা লে বলেন, সরকারি নির্দেশনা বা অনুমোদনের অধীনে কোনো কোম্পানি ‘হ্যাক-ব্যাক’ অভিযান চালালেও তাদের সামনে নতুন ধরনের প্রশ্ন তৈরি হবে—এই ধরনের অভিযানের ফলে কোম্পানি ও তাদের গ্রাহকদের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হলে তা কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং কখন সেই ঝুঁকি প্রকাশ্যে জানানো হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন। সরকার এখন শুধু বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব দিতে চাইছে না; বরং নির্দিষ্ট শর্তে তাদের অপরাধী হ্যাকারদের বিরুদ্ধে পাল্টা সাইবার হামলা চালানোর ক্ষমতাও দিতে যাচ্ছে। সমর্থকদের মতে এতে র‍্যানসমওয়্যার ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলা শক্তিশালী হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ভুলভাবে কোনো গোষ্ঠীকে শনাক্ত করা হলে তা বেসরকারি কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক সাইবার সংঘাতের মধ্যে টেনে নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন আইনি ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর