সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ঢাকা–রিয়াদে টানাপোড়েন
সৌদি আরবে বসবাসরত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ঢাকা–রিয়াদে টানাপোড়েন
সৌদি আরবে বসবাসরত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সৌদি আরব দ্রুত পাসপোর্ট দেওয়ার অনুরোধ জানালেও বাংলাদেশ পরিচয় ও নথিপত্র যাচাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বসবাসরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয় যাচাইয়ের পর ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বাকি যোগ্য ব্যক্তিদের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ থেকে একটি বিশেষ দল সৌদি আরবে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা। সৌদি আরব থেকে পাওয়া তালিকার ব্যক্তিদের পরিচয়, পূর্বের নথি এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই ছাড়া কাউকে পাসপোর্ট দেওয়া হবে না—এমন অবস্থানও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিষয়টির মূল জটিলতা হলো, সৌদি আরবে থাকা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অতীতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের অনেকের নথির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বৈধ ভ্রমণ নথি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব ব্যক্তির অবস্থান নিয়মিতকরণ ও প্রয়োজনীয় নথি নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা চাচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ায় তাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয় ও নথির বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তির হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকা মানেই তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন—এমনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও তাদের পুরোনো নথির তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা। কারণ, অতীতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বাংলাদেশি পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট পেয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও বহুমাত্রিক। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার, প্রবাসী কর্মী, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিকও জড়িত।
সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে সৌদি আরব বাংলাদেশে মৎস্য, খাদ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এই বৃহত্তর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুটি ঢাকা ও রিয়াদের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব দ্রুত সমাধান চাইলেও বাংলাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোতে চাইছে। ফলে এটিকে সরাসরি কূটনৈতিক বিরোধ বলা ঠিক হবে না; বরং দ্রুত সমাধানের সৌদি প্রত্যাশা এবং বাংলাদেশের যাচাই-নির্ভর প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে সৌদি আরবে থাকা প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে কারা প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও যাচাইয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য এবং বাকি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাদের সৌদি আরবে বৈধ অবস্থান ও ভবিষ্যৎ মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে থাকা এই জনগোষ্ঠীর পাসপোর্ট সমস্যা তাই শুধু একটি ভ্রমণ নথির বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট নীতি, সৌদি আরবের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই জড়িয়ে রয়েছে।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় ২২ হাজারের পাসপোর্ট যাচাইয়ের পর দেওয়া হয়েছে। বাকি যোগ্য ব্যক্তিদের প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ চলছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে এবং যাদের প্রয়োজনীয় নথি নেই তাদের বিষয়ে ঢাকা ও রিয়াদ কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।