কীভাবে রাউল কাস্ত্রোর নাতি দেহরক্ষী থেকে কিউবার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হলেন
এক দশক আগে কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাউল কাস্ত্রো যখন সরকারি সফরে প্যারিসে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর বহরের একজন শক্তসমর্থ দেহরক্ষী সবার নজর কেড়েছিলেন। এলিসি প্রাসাদে লালগালিচায় হাঁটার সময় ওই ব্যক্তি কাস্ত্রোর এতটাই কাছে ছিলেন যে ফরাসি সামরিক বাহিনীর এক সদস্য তাঁকে পেছনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময়কার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও তাঁকে পেছনে সরে যেতে ইশারা করেছিলেন
কীভাবে রাউল কাস্ত্রোর নাতি দেহরক্ষী থেকে কিউবার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হলেন
কাস্ত্রো পরিবারের দূত রাউল জি. রদ্রিগেজ কাস্ত্রো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন। একসময় কিউবার একটি চোরাচালান চক্রকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি মামলায় তাঁর নামও উঠে এসেছিল।
ডেভিড সি. অ্যাডামস ও ফ্রান্সেস রব্লেস
এক দশক আগে কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাউল কাস্ত্রো যখন সরকারি সফরে প্যারিসে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর বহরের একজন শক্তসমর্থ দেহরক্ষী সবার নজর কেড়েছিলেন। এলিসি প্রাসাদে লালগালিচায় হাঁটার সময় ওই ব্যক্তি কাস্ত্রোর এতটাই কাছে ছিলেন যে ফরাসি সামরিক বাহিনীর এক সদস্য তাঁকে পেছনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময়কার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও তাঁকে পেছনে সরে যেতে ইশারা করেছিলেন।
সরকারি অনুষ্ঠানের ছবিতে বারবার কাস্ত্রোর পাশে ঢুকে পড়া ওই নিরাপত্তাকর্মী আর কেউ নন—রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল জি. রদ্রিগেজ কাস্ত্রো। তিনি কিউবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্নেল।
আজ সেই একসময় প্রায় অপরিচিত দেহরক্ষীই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। যদিও তিনি কখনো কোনো সরকারি নির্বাচিত পদে ছিলেন না। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কিউবার পরবর্তী নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন—এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিদের তালিকাতেও তাঁর নাম এসেছে।
সাবেক সিনেটর প্যাট্রিক লেহির পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহযোগী টিম রিজার বলেন, “তিনি ওই সরকার কীভাবে পরিচালিত হয়, তারই উদাহরণ। এটা অনেকটা পারিবারিক ব্যবসার মতো। এক দশক আগে যাকে প্রেসিডেন্ট কাস্ত্রোর দেহরক্ষী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, কোনো না কোনোভাবে, কোনো এক উপায়ে, তিনি তার চেয়ে অনেক বড় ভূমিকায় পরিণত হয়েছেন।”
তবে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো তাঁর প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে কিউবা থেকে মানুষ পাচার এবং দেশে অবৈধ পণ্য আনার একটি বড় চোরাচালান নেটওয়ার্ককে সুরক্ষা দিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। সাক্ষাৎকার ও আদালতের নথিতে এমন অভিযোগের কথা পাওয়া গেছে।
৪২ বছর বয়সী রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে চুরি করা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনা পণ্য কিউবায় ঢুকতে সহায়তা করা, ঘুষ হিসেবে বিলাসবহুল সামগ্রী গ্রহণ এবং কিউবায় পলাতক অপরাধীদের অবাধে চলাফেরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্তে অন্তত ২১ জনের সাজা হয়েছে এবং তাদের কয়েক দশকের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
এই প্রতিবেদনটি আদালতের নথি এবং প্রায় এক ডজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে অবগত, আবার কেউ ওই অপরাধ তদন্ত সম্পর্কে জানেন।
রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেল এবং একজন পারস্পরিক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ জানানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। কিউবার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কিউবার কিছু কর্মকর্তাকেও বিস্মিত করেছে। তারা তাঁকে মূলত তাঁর দাদার দেখাশোনাকারী হিসেবেই দেখতেন।
তবে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির এক কর্মকর্তা গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে “চরিত্রহননের” শিকার হয়েছেন। তাঁর মতে, এর উদ্দেশ্য কিউবার সরকারকে বিভক্ত হিসেবে উপস্থাপন করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে কিউবা সরকারকে টিকিয়ে রাখা এবং আলোচনার পথ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি, রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তিনি তাঁর দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা গোপন করেননি। তবে কিউবার অভ্যন্তরে তাঁর সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
কিউবার চোরাচালানকারীরা
মানবপাচারকারী ওই নেটওয়ার্কটি “কিউবান মাফিয়া ইন কুইন্টানা রু” নামে পরিচিত ছিল। মেক্সিকোর পূর্বাঞ্চলীয় কুইন্টানা রু রাজ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় এই নাম দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং প্রসিকিউটরদের সঙ্গে সহযোগিতা করা অপরাধী চক্রের সদস্যদের মতে, এই চক্র ফ্লোরিডা থেকে চুরি করা নৌযান ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক কিউবানদের দেশ থেকে বের করে আনত।
কিউবান অভিবাসীদের মেক্সিকোতে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে রাখা হতো। অর্থ না দিলে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো বলে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথি ও তদন্ত সম্পর্কে অবগত কয়েকজনের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, মামলার দুই আসামি রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে ওই চক্রের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। জোসে মিগেল গনসালেস ভিদাল এবং রেইনালদো ক্রেসপো মার্কেস—দুজনেই দোষ স্বীকার করেন এবং দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড পান।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের কাছে চক্রটির এক নেতা দাবি করেন, রদ্রিগেজ কাস্ত্রো কিউবার ভেতরে ও বাইরে তাদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করতেন।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের করা একটি মামলায়ও তাঁর নাম উঠে আসে বলে তদন্তের প্রমাণ এবং তদন্ত সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন।
তবে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো এই তদন্তের লক্ষ্যবস্তু কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আদালতে দাখিল করা একটি স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি অনুযায়ী, চোরাচালান চক্রটি বিদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার জন্য দক্ষিণ ফ্লোরিডা থেকে নৌযান চুরি করত। এই বিবৃতিতে গনসালেস ভিদাল দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং তাঁকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ওই বিবৃতিতে রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর নাম ছিল না।
তবে আদালতের নথি অনুযায়ী, গনসালেস ভিদাল ও আরেক আসামি মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো ছিলেন সেই বিদেশি কর্মকর্তাদের একজন, যাঁকে একটি চুরি করা নৌযান দেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত এক বিচারের সময় বিষয়টি প্রকাশ্য আদালতেও আলোচিত হয়। এক প্রতিরক্ষা আইনজীবী সহযোগী সাক্ষী ক্রেসপোকে জিজ্ঞাসা করেন, এমন একটি বৈঠক সম্পর্কে তিনি প্রসিকিউটরদের কী জানিয়েছিলেন, যেখানে গনসালেস ভিদাল ও রদ্রিগেজ কাস্ত্রো কিউবায় তাঁর কাছে একটি নৌযান পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
চোরাচালান চক্রে ভূমিকার জন্য ক্রেসপো বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
তিনজনের ভাষ্য অনুযায়ী, গনসালেস ভিদাল বলেছিলেন, চোরাচালানকারীরা রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে ঘুষ দিয়েছিল, যাতে কিউবার কোস্ট গার্ড ও কাস্টমস কর্মকর্তারা তাদের কাজে বাধা না দেন।
গনসালেস ভিদালের দাবি অনুযায়ী, মেক্সিকোতে চুরি করা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনা পণ্য কিউবার কাস্টমস পার করে দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে একটি ফাউন্টেন ৩৮ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান, একটি রোলেক্স ঘড়ি, সুজুকি মোটরবাইক এবং লুই ভুইতন পোশাকসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, পরে এসব পণ্য কিউবার সরকারি দোকানে বিক্রি করা হয়।
তদন্ত সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, এ বক্তব্যকে চোরাচালান চক্রের সদস্যদের মোবাইল ফোন থেকে এফবিআই উদ্ধার করা টেক্সট মেসেজ ও ভয়েস মেইলও সমর্থন করেছিল।
গনসালেস ভিদালের আইনজীবী হুয়ান ডি. বেরিওস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
সম্প্রতি USA Today-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো বলেন, নিজের কোনো সম্পদ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “সম্পদশালী বন্ধু ও অনুরাগীরা” তাঁর ফ্যাশনেবল পোশাক, বিলাসবহুল বিদেশি গাড়ি এবং ব্যয়বহুল বিদেশ সফরের খরচ বহন করেছেন।
‘মানহানিকর’ অভিযোগ
কিউবার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস আর. ফের্নান্দেস দে কসিও নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে “মানহানিকর” বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে আলোচনার সময় কিউবার কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোর মাধ্যমে কিউবানদের ব্যাপক চোরাচালানের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিলেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেসব অভিযোগের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “আমরা তাদের সতর্ক করেছি। একের পর এক বৈঠকে জিজ্ঞেস করেছি—‘আপনারা কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? কী করেছেন?’”
তিনি আরও বলেন, “আমি কোনোভাবেই সন্দেহ করি না যে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলে এমন সংগঠন রয়েছে, যারা কিউবানদের যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে অর্থ উপার্জন করছে। কিন্তু আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, এর সঙ্গে কিউবার সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধের জবাব দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একজন মার্কিন নাগরিক বলেন, চোরাচালানের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বস্তুগত সম্পদের প্রতি আগ্রহকে পুঁজিবাদী ধারণার প্রতি তাঁর উন্মুক্ততার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।
রদ্রিগেজ কাস্ত্রো তাঁর জীবনযাপন নিয়ে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি।
তিনি USA Today-কে বলেন, “অনেক মানুষ আমার মতো জীবনযাপন করতে পারে না—এটা আমাকে কষ্ট দেয়। আর আমি প্রতিদিন সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কাজ করছি।”
কিউবার অভিজাতদের ‘সোনার ছেলে’
রদ্রিগেজ কাস্ত্রো হলেন রাউল কাস্ত্রোর বড় মেয়ে দেবোরাহ কাস্ত্রো এসপিন এবং প্রয়াত জেনারেল লুইস আলবার্তো রদ্রিগেজ লোপেজ-কায়েহার ছেলে।
লুইস আলবার্তো ছিলেন কিউবার অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং দেশটির সামরিক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য GAESA প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিউবার দুর্বল অর্থনীতির বড় একটি অংশ এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে।
তাঁর বাবা-মায়ের দাম্পত্য জীবন ভালো ছিল না। তাই শৈশবের বড় একটি সময় রদ্রিগেজ কাস্ত্রো তাঁর দাদা-দাদির বাড়িতে কাটিয়েছেন বলে তাঁকে ছোটবেলা থেকে চেনেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন।
তাঁকে “রাউলিতো” নামেও ডাকা হয়। তাঁর আরেক ডাকনাম “এল কাংগ্রেখো”—স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ “কাঁকড়া”। জন্মের সময় তাঁর এক হাতে অতিরিক্ত একটি আঙুল থাকায় এই ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল।
বিপ্লবী পরিবারের সন্তান হলেও তিনি উচ্চবিত্ত পরিবারের বংশধর। তাঁর দাদি ছিলেন ব্যাকার্ডি রাম সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী।
তিনি চরম খেলাধুলা, উত্তেজনাপূর্ণ গানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং কিউবার বিপ্লবী অভিজাতদের অন্য সদস্যদের তুলনায় কম পরিশীলিত জীবনযাপন করতেন।
তিনি হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়েন। কিউবার বিপ্লবের এক বীরের নির্বাসিত ছেলে এবং বহু বছর কাস্ত্রো পরিবারের ঘনিষ্ঠ থাকা হুয়ান হুয়ান আলমেইদার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রদ্রিগেজ কাস্ত্রো তাঁর দাদার সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেতেন।
আলমেইদা তাঁকে স্নেহশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “কিউবার ভেতরের চেয়ে দেশের বাইরে তিনি বেশি পরিচিত। কাংগ্রেখো এবং সব কাস্ত্রোই জানেন যে তাঁর ক্ষমতা ততদিনই থাকবে, যতদিন তাঁর দাদা বেঁচে থাকবেন।”
রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে প্রায়ই দামি ডিজাইনার পোশাক পরা অবস্থায় ছবি তুলতে দেখা যায়। তরুণ বয়সে কনসার্টে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, রেগেটন জুটি Gente de Zona-র সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নৌযানে ঘোরাঘুরির ভিডিওতেও তাঁকে দেখা যেত।
পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন, কখনো কখনো তিনি তাঁর দাদার BMW গাড়িতে হাভানায় ঘুরতেন। এতে এমন কিছু মানুষ বিরক্ত হতেন, যারা মনে করতেন—দেশের মানুষ যখন খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে ভুগছে, তখন এ ধরনের বিলাসী জীবন কিউবার সরকারের জন্য খারাপ বার্তা দেয়।
রদ্রিগেজ কাস্ত্রো অসাধারণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। তাঁর দাদার প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই তিনি উপস্থিত থাকতেন—এমনকি প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গেও রাউল কাস্ত্রোর বৈঠকে তিনি ছিলেন।
প্রথমে তিনি দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করলেও পরে রাউল কাস্ত্রোর ব্যক্তিগত সহকারীর মতো ভূমিকায় চলে আসেন।
৯৫ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে কোনো সরকারি পদে নেই। কিন্তু কিউবায় তাঁকেই এখনও সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়।
চলতি বছর কিউবা যখন ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বৈঠক শুরু করে, তখন রদ্রিগেজ কাস্ত্রো আলাদাভাবে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, কিউবার ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য চাপ বাড়াতে সিআইএ গোপনে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আর্তুরো লোপেজ-লেভি রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর দ্বিতীয় চাচাতো ভাই। তাঁর মতে, রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে সমালোচনার বড় একটি অংশ এক দশকেরও বেশি সময় আগে ছড়িয়ে পড়া তাঁর উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ভিডিওকে কেন্দ্র করে।
তিনি বলেন, প্রায় সাত বা আট বছর ধরে তাঁর সঙ্গে রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর কথা হয়নি। তবে প্রকাশ্যে তাঁর ব্যক্তিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
তিনি বলেন, “তাঁর দাদার সঙ্গে সম্পর্কটা এমন একজন তরুণের সম্পর্ক থেকে বদলে গেছে, যে বেশ অপরিণত ছিল। এখন তিনি এমন একজন মানুষে পরিণত হয়েছেন, যার রাজনৈতিক জ্ঞান রয়েছে এবং দাদার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে—শুধু তাঁর নিরাপত্তার জন্য নয়, রাজনৈতিকভাবেও।”
“তিনি দরজার বাইরে ছিলেন না; তিনি প্রতিটি বৈঠকের ভেতরেই ছিলেন।”
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ডেভিড ওভাল ও জ্যাক নাইকাস। গবেষণায় সহায়তা করেছেন সিমাস হিউজ ও ক্রিস্টেন নয়েস।
ফ্রান্সেস রব্লেস লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক। তিনি ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের সংবাদ কাভার করছেন।