চোখের সামনে এক বিমান, অদৃশ্য ট্রাম্প! বিশ্বকে রক্ষায় নীরব নিরাপত্তা অভিযান
ক্যামেরার সামনে উঠলেন পুরোনো Air Force One-এ। সাংবাদিকরাও জানলেন, এই বিমানেই তুরস্ক ছাড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তবে তখন অন্য গল্প। ইরানের সম্ভাব্য হত্যার হুমকির আশঙ্কায় গোপনে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয় ছোট সামরিক বিমান C-32A-তে। আর পুরো ঘটনাটি সাজানো হয়েছিল এমনভাবে, যাতে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান কেউ জানতে না পারে।
চোখের সামনে এক বিমান, অদৃশ্য ট্রাম্প! বিশ্বকে রক্ষায় নীরব নিরাপত্তা অভিযান
তুরস্ক ছাড়ার সময় ট্রাম্পকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা অভিযান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাইয়ে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় NATO সম্মেলন শেষে দেশ ছাড়ার সময় একটি নজিরবিহীন নিরাপত্তা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইরান থেকে প্রেসিডেন্টকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়ার পরই এই গোপন অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে The Washington Post জানিয়েছে। Reuters এবং Associated Press পরবর্তীতে Washington Post-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঘটনাটি প্রকাশ করে।
ঘটনাটি ঘটে ৮ জুলাই ২০২৬, NATO শীর্ষ সম্মেলন শেষে ট্রাম্প যখন আঙ্কারা থেকে যুক্তরাজ্যের RAF Mildenhall-এর উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন। এর আগে ট্রাম্প কাতার সরকারের দেওয়া একটি নতুন Boeing 747-8 বিমানে করে তুরস্কে পৌঁছেছিলেন। বিমানটি প্রেসিডেন্টের সাময়িক Air Force One হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংস্কার করা হয়েছিল।
প্রকাশ্যে এক বিমান, বাস্তবে অন্য বিমান
আঙ্কারা বিমানবন্দরে সাংবাদিক ও ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে পুরোনো প্রেসিডেন্ট বিমানটিতে উঠতে দেখা যায়। সেই বিমানটিই তাঁর যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা ছিল বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল একটি decoy বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান।
Washington Post-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, পুরোনো Air Force One-এ ওঠার কয়েক মিনিট পর ট্রাম্পকে বিমানটির নিচের অংশে ব্যবহৃত একটি বিশেষ বিমানবন্দর catering truck-এর মাধ্যমে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে একটি অপেক্ষমাণ US Air Force C-32A সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বিমানেই তিনি প্রকৃতপক্ষে তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে উড়াল দেন।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ট্রাম্প পুরোনো Air Force One-এ আছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি তখন অন্য একটি সামরিক বিমানে।
সাংবাদিকরাও বিভ্রান্ত ছিলেন
অভিযানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর গোপনীয়তা। পুরোনো Air Force One-এ থাকা সাংবাদিক ও কিছু কর্মীও প্রথমে জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট তাঁদের সঙ্গে ওই বিমানে নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাংবাদিকদের বিমানের জানালার শেড নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল। এতে বাইরে থেকে বিমানের গতিবিধি বা প্রেসিডেন্টের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্রাম্পকে বহনকারী C-32A প্রায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে স্থানীয় সময় যুক্তরাজ্যে পৌঁছায়। এরপর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সাংবাদিক ও White House staff বহনকারী পুরোনো Air Force One-ও RAF Mildenhall-এ পৌঁছায়।
এর ফলে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ট্রাম্প পুরোনো Air Force One-এই এসেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যে তাঁকে পুরোনো বিমান থেকে নামতেও দেখা যায়।
তাহলে C-32A থেকে তিনি আবার পুরোনো Air Force One-এ কীভাবে গেলেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে C-32A থেকে কীভাবে আবার পুরোনো Air Force One-এ নেওয়া হয়েছিল তার সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ, তাঁর গোপন স্থানান্তরের প্রথম ধাপ সম্পর্কে রিপোর্টে বিস্তারিত থাকলেও যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর C-32A থেকে পুরোনো বিমানে ফিরে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
এটি ইচ্ছাকৃত নিরাপত্তা গোপনীয়তার অংশও হতে পারে।
কেন এই গোপন অভিযান?
মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ইরানের সম্ভাব্য হামলা বা হত্যাচেষ্টার হুমকি।
ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র ছিল। তুরস্ক ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া একটি NATO সদস্য রাষ্ট্র। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতও চলছিল। Reuters-এর আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন কাতারি বিমানের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল এবং পুরোনো প্রেসিডেন্ট বিমানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিষ্ঠিত ছিল।
তবে নতুন Washington Post রিপোর্টে বিষয়টি আরও গুরুতর বলে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য ইরানি হত্যার হুমকি এই deception operation-এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
কাতারের দেওয়া নতুন Air Force One নিয়ে বিতর্ক
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কাতারের দেওয়া নতুন Boeing 747-8।
বিমানটি কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দেয় এবং L3Harris Technologies সেটিকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করে সংস্কার করে। এর মূল্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিতর্ক ছিল।
বিশেষ করে পুরোনো presidential aircraft-এর মতো সব ধরনের missile-detection, countermeasure এবং secure communications capability নতুন বিমানটিতে তখনও সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। AP ও Washington Post-এর প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে বলেছিলেন, নতুন বিমানটি RAF Mildenhall-এ পাঠানো হচ্ছে যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সদস্যরা বিমানটি দেখতে পারেন। আর তিনি পুরোনো Air Force One-এ করে যুক্তরাজ্যে যাবেন পুরোনো দিনের স্মৃতির কারণে।
কিন্তু পরবর্তী Washington Post রিপোর্টে জানা যায়, এই ব্যাখ্যার আড়ালে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কারণ ছিল।
White House কী বলেছে?
White House সরাসরি গোপন অপারেশনের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিশ্চিত করেনি। তবে Communications Director Steven Cheung নিরাপত্তাজনিত বিভ্রান্তিমূলক কৌশল ব্যবহারের বিষয়টি কার্যত স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে distraction এবং misdirection-সহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। White House-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একাধিক হুমকি থাকায় তাঁর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, Pentagon তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
এটি নজিরবিহীন হলেও সম্পূর্ণ নতুন কৌশল নয়
এ ধরনের deception বা decoy operation মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একেবারে অজানা নয়।
Washington Post-এর প্রতিবেদনে ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট Bill Clinton-এর পাকিস্তান সফরের একটি ঘটনার সঙ্গে এই অপারেশনের তুলনা করা হয়েছে। সেবারও প্রেসিডেন্টের প্রকৃত গতিবিধি আড়াল করতে একটি বিভ্রান্তিমূলক বিমান ব্যবহারের কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
তবে এবারের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হওয়ার কারণ হলো—একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে একটি presidential aircraft-এ ওঠার পর airport catering vehicle-এর মাধ্যমে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।