কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আবারও ‘কঠোর সামরিক পদক্ষেপে’ ফেরার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও “খুব শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপে” ফিরে যাবে। সোমবার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে খুবই গভীর আলোচনা করছি। যদি তা সফল না হয়, তাহলে আমরা আবারও অত্যন্ত কঠোর সামরিক পদক্ষেপে ফিরে যাব

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আবারও ‘কঠোর সামরিক পদক্ষেপে’ ফেরার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আবারও ‘কঠোর সামরিক পদক্ষেপে’ ফেরার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও “খুব শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপে” ফিরে যাবে। সোমবার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে খুবই গভীর আলোচনা করছি। যদি তা সফল না হয়, তাহলে আমরা আবারও অত্যন্ত কঠোর সামরিক পদক্ষেপে ফিরে যাব।”

আলোচনার জন্য কতদিন সময় দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “খুব বেশি সময় নয়। হয় দ্রুত অগ্রগতি হবে, না হলে কিছুই হবে না।”

পরে একই দিনে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প বলেন, “তারা (ইরান) বৈঠক করতে চায় এবং আমরা বৈঠক করছি। আমরা যা করেছি, তা না হলে তারা কখনোই আলোচনায় আসত না। আমরা যদি দুর্বল অবস্থায় থাকতাম, তারা কখনো বৈঠকের অনুরোধ করত না। তারা এখন আলোচনা চায় কারণ আমরা তাদের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করেছি।”

মিশিগানে এক সমাবেশে ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “তাদের ঘুষ দিয়ে থামানো যাবে না। তাদের পরাজিত করতে হবে, আর আমরা তা-ই করব। তবে দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। আপাতত খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে।”

তেহরানের ভিন্ন দাবি

অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংকট নিরসনে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না।”

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওমান-ইরান আলোচনা

এদিকে ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিগতভাবে কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি বা টোল আদায়ের বিষয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি।

গত শুক্রবার ও শনিবার তেহরানে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আলোচনা নতুন করে সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চীন, কাতার ও পাকিস্তানের সমর্থনে চলা এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় দুই সপ্তাহের হামলার পর সাময়িকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত রাখতে উৎসাহিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ

খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া এবং কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও হরমুজ প্রণালী এলাকায় বোমা হামলা বন্ধের সুপারিশ করেছেন। তাঁর মতে, অভিযানটি কার্যকারিতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।

সংঘাতের পটভূমি

ওয়াশিংটনের দাবি, জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘন করেছে ইরান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঠেকানোর চেষ্টা করায় তারা সামরিক অভিযান চালায়।

তবে ইরানের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলীয় এই নৌপথ ব্যবহারই যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে। তেহরানের মতে, যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকার কথা।

একজন কূটনীতিক জানান, তেহরানের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরান ও ওমানের প্রস্তাবগুলো এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে তা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।

মালাক্কা প্রণালীর মডেল

ওমান মে মাস থেকে ইরানকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো ফি আরোপ করা হলে তা স্বেচ্ছাভিত্তিক হতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘিত না হয়।

ওমান মালাক্কা প্রণালীর আদলে একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারী দেশগুলো স্বেচ্ছায় অর্থ দেবে। সেই অর্থ পরিবেশ সুরক্ষা ও নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় হবে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (IMO) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজও হরমুজ প্রণালীর ক্ষেত্রে মালাক্কা মডেল বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন।

ইরানের প্রস্তাব

ইরানের পরিবেশ বিভাগ একটি পৃথক পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রতিবছর ৫০ হাজারেরও বেশি জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার পারস্য উপসাগরে যে দূষণ সৃষ্টি করে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজের ধরন, বহনকৃত পণ্যের পরিমাণ, চলাচলের ইতিহাস এবং দূষণের মাত্রার ভিত্তিতে ইরান বিভিন্ন ধরনের ফি আদায় করতে পারবে।

ইরানি সংবাদমাধ্যমও ক্রমেই মালাক্কা মডেলকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। খাবারঅনলাইন সংবাদ সংস্থা একে “ইরানের জন্য উভয় পক্ষের লাভজনক (উইন-উইন)” সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ওমানের কঠিন অবস্থান

ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক হলেও বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন, এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্কিত নয়।

তিনি বলেন, “ইরান ও ওমান—উভয় উপকূলীয় রাষ্ট্র—হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে দুই দেশের সার্বভৌম অধিকার, ইরানের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পায়।”

তবে ওমান একটি জটিল অবস্থায় রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে নতুন টোল ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে, যদিও নির্দিষ্ট কিছু সেবার বিনিময়ে সীমিত ফি আরোপের বিষয়টি তারা বিবেচনা করতে পারে।

উত্তেজনা অব্যাহত

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের অবরোধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করছে।

ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রবিবার নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ রেখে ছয়টি জাহাজ দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে। এর মধ্যে একটি জাহাজের ওপর গুলি চালানো হয় এবং বাকি জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানি তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করেছে এবং তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা অব্যাহতি (sanctions waiver) প্রত্যাহার করেছে।

জাতিসংঘের প্রজেক্ট সার্ভিসেস অফিস (UNOPS) জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র পাঁচটি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করত।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর