গাজা ইস্যুতে বার্নহামের ক্ষমাপ্রার্থনা: প্রগতিশীল ভোটারদের ফেরাতে লেবারের ‘নতুন সূচনা’
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের গাজা যুদ্ধ নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনাকে দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ "রিসেট মুহূর্ত" হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন কেবল ভাষা ও অবস্থানের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব নীতিতেও প্রতিফলিত হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়
গাজা ইস্যুতে বার্নহামের ক্ষমাপ্রার্থনা: প্রগতিশীল ভোটারদের ফেরাতে লেবারের ‘নতুন সূচনা’
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের গাজা যুদ্ধ নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনাকে দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ "রিসেট মুহূর্ত" হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন কেবল ভাষা ও অবস্থানের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব নীতিতেও প্রতিফলিত হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা কিয়ার স্টারমার একটি সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এমন মন্তব্য করেন, যা অনেকের কাছে মনে হয়েছিল যে তিনি গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের জন্য বিদ্যুৎ ও পানি বন্ধ রাখার অধিকারকেও সমর্থন করছেন। যদিও পরে তার দল জানায়, মন্তব্যটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, তবুও ততদিনে ব্যাপক রাজনৈতিক ক্ষতি হয়ে যায়।
স্টারমারের ওই অবস্থানের কারণে লেবারের বহু মুসলিম কাউন্সিলর দল ছাড়ার হুমকি দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি তাদের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখলেও অনেকের মতে সেটি যথেষ্ট ছিল না।
এর পরপরই গাজায় যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোটের প্রশ্নে লেবারের ভেতরে বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দেয়। আটজন ফ্রন্টবেঞ্চ সদস্য পদত্যাগ করেন, যার মধ্যে জেস ফিলিপসও ছিলেন। এই ঘটনা লেবারের ভেতরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ঐতিহাসিকভাবে লেবার পার্টি ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলের দখলনীতি এবং ডানপন্থী সরকারগুলোর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটির একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে ইসরায়েলবিরোধী কিছু সমালোচনা ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগে রূপ নেয়। যুক্তরাজ্যের সমতা ও মানবাধিকার কমিশন (EHRC) লেবার পার্টিতে ইহুদি সদস্যদের বিরুদ্ধে "অবৈধ হয়রানির" প্রমাণ পায়, যদিও করবিন বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দলের অনেকের মতে, স্টারমার করবিনের সময়কার বিতর্ক থেকে নিজেকে আলাদা করতে গিয়ে গাজা ইস্যুতে সঠিক রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হন।
২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়তে থাকে। কিন্তু ব্রিটিশ জনগণের কাছে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বলে অনেকেই মনে করেন।
লেবারের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, "মানুষ স্টারমারের সেই এলবিসি সাক্ষাৎকারের কথাই মনে রেখেছে। এরপর আমরা যা-ই করেছি, মানুষ যেন তা আর লক্ষ্যই করেনি।"
এই পরিস্থিতিতে লেবার পার্টি তাদের প্রগতিশীল ভোটার, তরুণ, মুসলিম সম্প্রদায় এবং মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ভোটারদের একটি বড় অংশ হারায়। এদের অনেকেই গ্রিন পার্টি বা গাজাপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এই প্রেক্ষাপটে অ্যান্ডি বার্নহাম প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে গাজা যুদ্ধের শুরুতে লেবার "সঠিকভাবে বিষয়টি সামাল দিতে পারেনি"। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েল সরকারের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো নতুন পদক্ষেপ এমনভাবে নিতে হবে যাতে যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও উদ্বেগও বিবেচনায় থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে ইহুদিবিদ্বেষ বৃদ্ধির ঘটনাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
দলীয় কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা ইস্যু এখনো বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। তাই বার্নহামের নেতৃত্বে লেবার নতুনভাবে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
একজন লেবার নেতা বলেন, "অ্যান্ডি আমাদের জন্য একটি নতুন শুরু করার সুযোগ এনে দিয়েছেন। এটি মূলত ভাষা ও রাজনৈতিক সুরের পরিবর্তন। বহু প্রগতিশীল ভোটার আমাদের ছেড়ে গেছেন। এখন তাদের ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।"
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ক্ষমাপ্রার্থনা বা ভাষার পরিবর্তন যথেষ্ট হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বার্নহাম এখন পর্যন্ত কেবল অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করা বা আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি "বিবেচনা করবেন" বলে জানিয়েছেন। ফলে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন কতটা হবে এবং তা হারানো ভোটারদের ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।