ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাপ দেবেন ট্রাম্প
গত বছরের ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য
ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাপ দেবেন ট্রাম্প
গত বছরের ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।
গত বছরের সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্যে সম্মত হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এখন সেই প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের সময় এসেছে।
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ম্যাট হুইটেকার বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করেন, সব মিত্র দেশ অবিলম্বে ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে এবং তা বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নেবে।”
সোমবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। সফরের আগে তিনি আবারও অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র অন্য মিত্রদের তুলনায় প্রতিরক্ষা খাতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
গত মাসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি এটিকে “দ্য ট্রাম্প ট্রিলিয়ন” নামে উল্লেখ করে বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে ট্রাম্পের চাপের ফলেই ন্যাটো দেশগুলো ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুক কফি বলেন, আঙ্কারার সম্মেলন হবে গত বছরের প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় মূল্যায়ন। তার মতে, সদস্য দেশগুলো যদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে আসে, তাহলে ট্রাম্প এটিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবেন।
জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সম্মেলনের ফাঁকে বুধবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। ৪ জুলাই তিনি জেলেনস্কি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—উভয়ের সঙ্গেই টেলিফোনে কথা বলেছেন।
এ ছাড়া সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারার সঙ্গেও ট্রাম্পের বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস এ বৈঠকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য প্রকাশ করেনি। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়ার ভূমিকা বাড়তে পারে।
সম্মেলনের আয়োজক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করবেন ট্রাম্প। তবে অন্য কোনো ন্যাটো নেতার সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।
ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে টানাপোড়েন
জি–৭ সম্মেলনে তুলনামূলক ইতিবাচক পরিবেশ থাকলেও দেশে ফিরে আবারও কয়েকজন ইউরোপীয় নেতাকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন ট্রাম্প।
তিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ আগেভাগেই পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মেলোনি তা জোরালোভাবে অস্বীকার করেন এবং এর জেরে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল হয়। পরে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে মেলোনির একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, “RESTRAINING ORDER NEEDED।”
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের সিনেটরদের একটি প্রতিনিধিদল ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য, জোটটির প্রতি কংগ্রেসের সমর্থনের বার্তা দেওয়া।
সিনেটর জিন শাহিন বলেন, “ন্যাটো আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। এসব সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা জরুরি।”
‘ন্যাটো ৩.০’ ধারণা
ট্রাম্প প্রশাসন এখন “ন্যাটো ৩.০” ধারণার পক্ষে জোর দিচ্ছে। এই পরিকল্পনায় ইউরোপ নিজস্ব নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে কৌশলগত মনোযোগ বাড়াতে পারবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি চলতি বছর এই কৌশল তুলে ধরেন। পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দেন, ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের অবস্থান নিয়ে ছয় মাসব্যাপী পর্যালোচনা করা হবে।
এ নিয়ে ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
গত বছরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সরাসরি সামরিক ব্যয়ে এবং বাকি অংশ অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় করা হবে। তবে স্পেন ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা এই লক্ষ্য পূরণে সক্ষম নয়। আরও কয়েকটি দেশও উচ্চাভিলাষী এ লক্ষ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ইউরোপবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো লিয়ানা ফিক্স বলেন, “বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ এখনও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেদের কার্যকরভাবে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, যদিও তারা সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।”
ন্যাটো ট্রাম্পের অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে ‘আর্কটিক সেন্ট্রি’ নামে একটি নতুন সামরিক মহড়াও চালু করেছে। এর লক্ষ্য আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের তৎপরতা মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে এটি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।