তেহরানে আয়াতুল্লাহর রাষ্ট্রীয় জানাজায় জনসমুদ্র
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ তেহরানে সমবেত হন। শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দেখতে বিপুল সংখ্যক ইরানি তেহরানে জড়ো হন। কয়েক দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশ শাসনকারী খামেনি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হন
তেহরানে আয়াতুল্লাহর রাষ্ট্রীয় জানাজায় জনসমুদ্র
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ তেহরানে সমবেত হন। শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দেখতে বিপুল সংখ্যক ইরানি তেহরানে জড়ো হন। কয়েক দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশ শাসনকারী খামেনি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হন।
রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে ছয় দিনের শোকানুষ্ঠানের প্রথম দিনে ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। খামেনির মরদেহ দেশের বিভিন্ন শহরে নেওয়া হবে এবং তার শেষকৃত্যে লাখো-লাখো মানুষের অংশ নেওয়ার আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকরা জানান, কাচে আবদ্ধ ও ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের—যাদের মধ্যে তার এক কন্যা ও দুই নাতি-নাতনি ছিলেন—কফিন দেখে অনেক সমর্থক কান্নায় ভেঙে পড়েন। মঞ্চের ওপর খামেনির কফিনটি অন্যগুলোর চেয়ে উঁচুতে রাখা হয়েছিল।
বর্তমানে ইরান এক অস্থির সময় পার করছে। এ বছর সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধ শুরু হয়। সংঘাতের প্রথম দিনেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনিসহ ইরানের শীর্ষস্থানীয় বহু নেতা নিহত হন।
যদিও খামেনির সমর্থকেরা তাকে শোকের সঙ্গে স্মরণ করছেন, অনেক ইরানি এই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল শেষকৃত্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, ৩৭ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনে তিনি ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করেছেন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি বাড়তে দিয়েছেন।
তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি শেষকৃত্যের কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। নিয়োগের পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
খামেনিকে মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর দাফন করা হচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই আয়োজন সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কায় ইরানি কর্তৃপক্ষ এতদিন বড় আকারের শোকানুষ্ঠান আয়োজন থেকে বিরত ছিল। শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিদেশি অতিথি, সরকারি কর্মকর্তা এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান।
শনিবার দিনভর উপস্থিত জনতা "আমেরিকার মৃত্যু হোক" এবং "ইসরায়েলের ওপর আল্লাহর অভিশাপ" স্লোগান দেন। অনেকেই প্রতিশোধের দাবিতে ব্যানার বহন করেন এবং ট্রাম্পবিরোধী লাল ব্যানারের সামনে ছবি তোলেন।
৪৪ বছর বয়সী কবি আরাশ এমরানি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর তিনি ক্ষুব্ধ। তার অভিযোগ, যুদ্ধ শুরু করে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা "অখ্রিস্টীয়" কাজ। তিনি বলেন, "সবকিছুই খুব ভুল এবং খুবই দুঃখজনক।"
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তারা ইরান সরকারের অনুমতি নিয়ে এই অনুষ্ঠান কভার করেছে। সরকার নির্ধারণ করে দেয় সাংবাদিকরা কোন কোন অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন এবং তাদের সঙ্গে সরকার-নিযুক্ত একজন দোভাষী ও একজন গাইড ছিলেন। তাই অনুষ্ঠানে যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাদের মতামত পুরো ইরানি সমাজের প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারে। আবার কেউ কেউ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতেও অস্বস্তি বোধ করে থাকতে পারেন।
শনিবার তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) ওপরে উঠে যায়। প্রচণ্ড গরমে অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাকর্মীরা প্রস্তুত ছিলেন এবং অন্তত একজনকে স্ট্রেচারে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। ভিড়কে ঠান্ডা রাখতে ওপর থেকে পানির ফোয়ারা ছিটানো হয় এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা বরফভর্তি পাত্র থেকে ঠান্ডা পানি বিতরণ করেন।
সোমবার তেহরানে শোভাযাত্রা শেষে খামেনির মরদেহ প্রথমে কোম শহরে, এরপর ইরাকের কারবালা ও নাজাফে নেওয়া হবে। শিয়া মুসলমানদের কাছে এই তিনটি শহরের বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। বৃহস্পতিবার তার জন্মস্থান মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
তেহরানের এই আয়োজনকে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি প্রদর্শনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা সত্ত্বেও দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। খামেনির রক্ষণশীল সমর্থকদের কেউ কেউ অনুষ্ঠান মিস না করতে আগের রাতেই গাড়িতে ঘুমিয়েছিলেন।
তবে অনুষ্ঠানে কিছু কট্টরপন্থী ধর্মীয় সমর্থকের অসন্তোষও দেখা যায়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন। কিছু শোকাহত ব্যক্তি একটি ব্যানার বহন করেন, যাতে লেখা ছিল, "আমাদের শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধ কোথায়?"—যা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে উদ্দেশ্য করেই লেখা বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে।