দুই বাড়িতে তল্লাশির পরোয়ানা বেআইনি স্বীকার করল ব্রিটিশ পুলিশ আদালতে বড় ধাক্কা

অ্যান্ড্রুর দুই বাড়িতে তল্লাশির পরোয়ানা বেআইনি ছিল বলে পুলিশের স্বীকারোক্তি তবে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এখনও শেষ হয়নি আদালতের রায়ে।

দুই বাড়িতে তল্লাশির পরোয়ানা বেআইনি স্বীকার করল ব্রিটিশ পুলিশ আদালতে বড় ধাক্কা

দুই বাড়িতে তল্লাশির পরোয়ানা বেআইনি স্বীকার করল ব্রিটিশ পুলিশ আদালতে বড় ধাক্কা


অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের দুটি বাড়িতে তল্লাশি চালানোর জন্য ব্যবহৃত পরোয়ানা আইনসম্মত ছিল না বলে স্বীকার করেছে থেমস ভ্যালি পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে হওয়া শুনানিতে পুলিশের পক্ষ থেকে এই অবস্থান মেনে নেওয়ার পর সাবেক রাজপরিবারের সদস্যের করা আইনি চ্যালেঞ্জে বড় অগ্রগতি এসেছে। তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি তদন্ত শেষ হয়ে গেছে। বরং তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং তল্লাশির সময় জব্দ করা নথি ও অন্যান্য সামগ্রী পুলিশ আইন অনুযায়ী নিজেদের কাছে রাখতে পারবে কি না, সে বিষয়ে আরও আইনি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। 


ঘটনাটি মূলত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে তাঁর দুটি সম্পত্তিতে পুলিশ তল্লাশি চালায়। একটি ছিল নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এলাকায় তাঁর বাসস্থান, অন্যটি বার্কশায়ারের উইন্ডসর এলাকায় রয়্যাল লজ। তল্লাশির সময় পুলিশ বিভিন্ন সামগ্রী ও নথি জব্দ করে। পরে অ্যান্ড্রুর আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন, এসব তল্লাশি চালানোর জন্য যে আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছিল, তা আদৌ সঠিক ছিল কি না। 


৮ অক্টোবর লন্ডনের উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিকোলাস হিলিয়ার্ডের সামনে বিষয়টি ওঠে। আদালতে জানানো হয়, অ্যান্ড্রু এবং থেমস ভ্যালি পুলিশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে যে ওই তল্লাশি পরোয়ানাগুলো বেআইনি ছিল। বিচারপতি বলেন, পরোয়ানা চাওয়ার আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ ভুল হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, পরোয়ানা বাতিল হয়ে যাওয়ার অর্থ পুরো তদন্ত বেআইনি হয়ে যাওয়া নয় এবং এর ফলে চলমান তদন্তও বন্ধ হবে না। 


এই জায়গাটিই বর্তমান ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণভাবে তল্লাশির পরোয়ানা আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে পুলিশকে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে প্রমাণ বা গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী খোঁজার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়। অ্যান্ড্রুর মামলায় আদালত মনে করেছে, পরোয়ানা পাওয়ার জন্য যে আইনি বিধান ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে পরোয়ানাগুলো বাতিল করার পথ তৈরি হয়। 


পুলিশও এখন বিষয়টি মেনে নিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক আদালত যে নির্দিষ্ট আইনি বিধানের আওতায় পরোয়ানা অনুমোদন করেছিল, সেটি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। তাই পরোয়ানাগুলো আইনগতভাবে বাতিল করতে হয়েছে। তবে পুলিশ একই সঙ্গে জানিয়েছে, অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। তদন্তকারীরা সম্ভাব্য সব যুক্তিসংগত দিক খতিয়ে দেখবেন বলেও জানিয়েছে তারা। 


এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ফেব্রুয়ারির তল্লাশিতে পুলিশ যে সামগ্রীগুলো জব্দ করেছিল, সেগুলোর কী হবে। আদালতে এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা আইনি কার্যক্রম চলছে। পুলিশ ওই সামগ্রীগুলো ভবিষ্যৎ তদন্তে ব্যবহার করার জন্য নিজেদের কাছে আইনসম্মতভাবে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ফলে পরোয়ানা বাতিল হলেও তদন্তকারীদের হাতে থাকা সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ নথি ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। 

অ্যান্ড্রুর আইনজীবীরা এর আগে আদালতের কাছে পরোয়ানাগুলোর বৈধতা পর্যালোচনার আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মূল প্রশ্ন ছিল, পুলিশ এবং যে আদালত থেকে তল্লাশির অনুমতি নেওয়া হয়েছিল, তারা যথাযথ আইন অনুসরণ করেছিল কি না। এই আবেদনকে কেন্দ্র করেই উচ্চ আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৫ অক্টোবর এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের খবর প্রকাশ্যে আসে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যায়। 


অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে যে তদন্ত চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দু সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য অন্য ব্যক্তির কাছে পাঠানোর অভিযোগ। তদন্তটি প্রয়াত জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে অ্যান্ড্রুর সম্পর্ক ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া সন্দেহ ও প্রকাশিত নথির সঙ্গে যুক্ত। অ্যান্ড্রু অবশ্য কোনো অপরাধ করার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে কোনো অভিযোগ গঠন না করেই তদন্তের আওতায় মুক্ত রাখা হয়। 

অ্যান্ড্রু ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, ওই সময় তিনি বিদেশ সফরসংক্রান্ত কিছু তথ্য এপস্টিনের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশিত নথির ভিত্তিতে এসব তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো নথি বা অভিযোগ সামনে আসা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয়নি। 


চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারের পর অ্যান্ড্রুর দুটি সম্পত্তিতে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ ২৪ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছিল যে তল্লাশি কার্যক্রম শেষ হয়েছে। পরে অ্যান্ড্রুর পক্ষ থেকে সেই তল্লাশির আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অর্থাৎ এখন আদালতের সিদ্ধান্তটি মূলত তদন্তের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সে বিষয়ে নয়; বরং পুলিশ যে পদ্ধতিতে তল্লাশির অনুমতি নিয়েছিল, সেই পদ্ধতি আইন অনুযায়ী সঠিক ছিল কি না, সেটিই ছিল মূল প্রশ্ন। 


বিচারপতি হিলিয়ার্ডের বক্তব্যে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, তল্লাশির পরোয়ানা বাতিল হওয়া তদন্তের সমাপ্তি ঘটায় না। একইভাবে পুরো তদন্তও বেআইনি হয়ে যায় না। ফলে অ্যান্ড্রু এই আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত থেকে তিনি পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যাননি। পুলিশ এখনও অভিযোগের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করতে পারবে, যদিও জব্দ করা সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ে আলাদা আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। 


এই রায় অ্যান্ড্রুর জন্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর তাঁর রাজকীয় উপাধি ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক নতুন করে তীব্র হওয়ার পর রাজপরিবার তাঁর অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরি করে। বর্তমানে তিনি আগের মতো রাজকীয় দায়িত্ব পালন করেন না। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন। 


এদিকে আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তল্লাশিতে নেওয়া সামগ্রী পুলিশ ফেরত দেবে কি না, নাকি কোনো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলো তদন্তে ব্যবহার করার অনুমতি পাবে, সেটি এখন সামনে আসা বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে পরবর্তী আদালতের সিদ্ধান্ত অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের ভবিষ্যৎ গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। 

ফ্যাক্ট যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির মূল বক্তব্য সঠিক হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়গত ভুল আছে। বলা হচ্ছে, অ্যান্ড্রুর দুই বাড়িতে তল্লাশির পরোয়ানা গত বছর ব্যবহার করা হয়েছিল। আসলে সংশ্লিষ্ট তল্লাশি ও গ্রেপ্তার হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আর পরোয়ানাগুলো অনুমোদন করা হয়েছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। ৮ অক্টোবর ২০২৬ উচ্চ আদালতে পরোয়ানাগুলো বেআইনি হিসেবে বাতিলের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তাই ঘটনাটি গত বছরের নয়, চলতি বছরের ঘটনা। 


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশ সরাসরি অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে তদন্তকে বেআইনি বলে স্বীকার করেনি। তারা নির্দিষ্টভাবে তল্লাশি পরোয়ানা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আইনি ভিত্তির ভুল স্বীকার করেছে। আদালতও বলেনি যে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বা তদন্ত শেষ। বরং তদন্ত চলবে এবং জব্দ করা সামগ্রী নিয়ে আরও আইনি সিদ্ধান্ত হবে। ফলে ঘটনাটিকে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের পুরোপুরি সমাপ্তি হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না। 


সব মিলিয়ে, ৮ অক্টোবরের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি জয়। তাঁর দুটি সম্পত্তিতে চালানো তল্লাশির ভিত্তি যে আইনগতভাবে সঠিক ছিল না, সেটি পুলিশ আদালতে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরও সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এখন মূল নজর থাকবে জব্দ করা সামগ্রীর ভবিষ্যৎ এবং তদন্তকারীরা সেগুলো আইনসম্মতভাবে ব্যবহার করতে পারবেন কি না, সেই বিষয়ে পরবর্তী আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর