ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের, মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা ও উত্তেজনা
ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সেনা ও যুদ্ধজাহাজ বাড়াচ্ছে, তেহরানও সম্ভাব্য পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি ক্রমাগত জোরদার করছে বলে খবর।
ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের, মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা ও উত্তেজনা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও সামরিক তৎপরতার তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, ২ অক্টোবর পর্যন্ত ইরানে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। বরং ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপের জন্য বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ‘এখনই হামলা চলছে’ এমন বক্তব্যকে এই মুহূর্তে নিশ্চিত খবর হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, হামলার আশঙ্কা বাস্তব এবং সামরিক প্রস্তুতিও দ্রুত বাড়ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দিকে প্রায় নয় হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। এসব সেনার একটি বড় অংশ যুদ্ধজাহাজে করে অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরীও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা বিশ হাজারের বেশি হতে পারে।
এই সামরিক সমাবেশের পেছনে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং নতুন করে হামলার সম্ভাবনা বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে এসব ঘটনায় ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানও সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য প্রস্তুতি জোরদার করেছে। তেহরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণ করলে পাল্টা জবাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মধ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, আঞ্চলিক মিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও দেখা যাচ্ছে। ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বেড়েছিল। পরে ২ অক্টোবর কিছুটা কমলেও বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক মোতায়েন, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকেরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং সংঘাত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সামরিক সংঘর্ষ, নৌপথের নিরাপত্তা সংকট এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পাশাপাশি চলতে থাকে। সাময়িক বিরতির পরও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি। আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানে হামলা করছে’ ধরনের বার্তা ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। অতীতের হামলার ছবি, পুরোনো বিস্ফোরণের দৃশ্য বা সামরিক মহড়ার ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর দাবি তৈরি করা হয়। তাই কোনো বিস্ফোরণ, ধোঁয়া বা ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি দেখেই সেটিকে ২ অক্টোবরের নতুন মার্কিন হামলার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
সর্বশেষ তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে, কিন্তু ২ অক্টোবর নতুন করে বড় আকারের হামলা শুরু হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অবশ্যই সম্ভাব্য অভিযানের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতিও পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি নতুন করে সরাসরি হামলা শুরু হয়, তাহলে সংঘাত কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী, উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোও সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে চলে আসতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রবাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনৈতিক পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান আলোচনা থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও প্রকাশ্যে বলছে, সামরিক চাপের পাশাপাশি সমঝোতার সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কিন্তু দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। ইরান তার সার্বভৌমত্ব, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিজস্ব অধিকার বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা।
আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান যদি সেসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। একইভাবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো বড় সামরিক ঘটনা ঘটলে এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশের জ্বালানি আমদানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাহাজের বীমা ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং তেলের দাম একসঙ্গে বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি সংক্ষিপ্ত বার্তাকে সরাসরি যুদ্ধের নতুন ধাপের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না। বর্তমান তথ্য বলছে, দুই পক্ষই শক্তি প্রদর্শন করছে, সম্ভাব্য সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক বিকল্প পুরোপুরি ছাড়েনি। নতুন হামলা সত্যিই শুরু হলে তার প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ আসবে সরকারি সামরিক ঘোষণা, উপগ্রহচিত্র, স্থানীয় তথ্য এবং একাধিক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সমন্বিত প্রতিবেদনে। সেই পর্যায় পর্যন্ত ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানে হামলা করছে’ দাবিটিকে নিশ্চিত সত্য নয়, বরং অযাচাইকৃত ও বিভ্রান্তিকর দাবি হিসেবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান।