শেষ মুহূর্তের স্থগিতাদেশ বাতিল, খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দিল সর্বোচ্চ আদালত
খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ খুলে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত, তবে বুধবার রাতে সাজা কার্যকর হয়েছে কি না তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত নয়।
শেষ মুহূর্তের স্থগিতাদেশ বাতিল, খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দিল সর্বোচ্চ আদালত
খ্রিস্টা পাইকের বয়স এখন ৫০ বছর। ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি টেনেসির নক্সভিলে ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। হত্যার সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি এবং তাঁর তৎকালীন প্রেমিক তাদারিল শিপকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পাইকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও শিপ তখন ১৭ বছর বয়সী হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যেখানে পরবর্তীতে মুক্তির সুযোগ রয়েছে।
মামলার নথি ও আদালতের কার্যক্রম অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে পাইকের মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। টেনেসির সর্বোচ্চ আদালত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারণ করে। আদালতের আদেশে বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষ অন্য কোনো নির্দেশ না দিলে ওই তারিখে সাজা কার্যকর করা হবে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত দিন বুধবার সকালে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে প্রত্যক্ষদর্শীরা ইতোমধ্যে উপস্থিত ছিলেন। সকাল ৯টার দিকে ষষ্ঠ আপিল আদালতের তিন বিচারকের বেঞ্চ ২-১ ভোটে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেয়। আদালত জানায়, পাইকের আইনজীবীদের উত্থাপিত কিছু বিষয় আরও পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শৈশবে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেটি পর্যালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
এই স্থগিতাদেশের পর টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় দ্রুত সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে। রাজ্যের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, নির্ধারিত সময়ের মাত্র অল্প আগে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হলে ভুক্তভোগীর পরিবার আরও মানসিক আঘাতের মুখে পড়বে। অন্যদিকে পাইকের আইনজীবীরা বলেন, তাঁর শৈশবের গুরুতর নির্যাতন, মানসিক সমস্যার ইতিহাস এবং হত্যার সময় তাঁর বয়সের মতো বিষয়গুলো মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের সময় যথেষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
এরপর মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত আপিল আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করে। তিন বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁরা হলেন সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কাগান এবং কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন। ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতিদের মধ্যে সোটোমেয়র লিখিত মতামত দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পাইকের কিছু আইনি চ্যালেঞ্জ তখনও বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির ‘তিন বিচারপতি ভিন্নমত দিয়েছেন’ অংশটি সঠিক। তবে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শ দিয়ে বর্ণনা করার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে তাঁদের নাম উল্লেখ করাই তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি। আদালতের নথিতে তাঁদের ভিন্নমতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
পাইক হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার সময় তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর ছিল এবং শৈশব থেকেই তিনি গুরুতর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের দাবি, এসব অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক অবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলেছিল এবং মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের সময় সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। পাইকের পক্ষে দাখিল করা নথিতে তাঁর মানসিক অসুস্থতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে হত্যার শিকার কোলিন স্লেমারের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পাইকের সাজা কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মেয়েকে হারানোর পর প্রায় তিন দশক ধরে তিনি সেই শোক বহন করছেন। তিনি পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর দেখতে টেনেসিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ডটি নক্সভিল এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, পাইক মনে করেছিলেন স্লেমার তাঁর প্রেমিককে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছেন। পরে পাইক ও তাঁর সহযোগীরা স্লেমারকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করা এবং ভারী পাথরের টুকরা দিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। মামলাটি সে সময় আরও আলোচিত হয় কারণ নিহতের শরীরে একটি পাঁচকোণা চিহ্ন খোদাই করা হয়েছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে সে সময়কার কথিত শয়তানপূজা নিয়ে সামাজিক আতঙ্কের বিষয়টি জড়িয়ে যায়।
পাইক ছিলেন এই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি। তাঁর তৎকালীন প্রেমিক তাদারিল শিপকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে মুক্তির সুযোগ রাখা হয়। অপর সহযোগী শাদোলা পিটারসন রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তুলনামূলক কম সাজা পান। ফলে একই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বয়স, ভূমিকা ও সাজা নিয়ে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আইনগত আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেনেসিতে নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরলতা। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যটিতে অন্তত দুই শতাব্দীর মধ্যে কোনো নারীকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের পর দেশজুড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর সংখ্যা খুবই কম। মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারের হিসাবে ওই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যা মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় এক শতাংশ।
টেনেসি সংশোধন বিভাগ আগেই জানিয়েছিল, পাইকের মৃত্যুদণ্ড ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় রিভারবেন্ড কারাগারে কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সরকারি নথিতে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির ব্যবস্থা এবং কারাগারে প্রবেশের সময়সূচিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর টেনেসি সংশোধন বিভাগের একজন মুখপাত্র জানান, বুধবার রাতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে বর্তমানে পাওয়া নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর মৃত্যুদণ্ডটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে কি না, তার স্বতন্ত্র ও স্পষ্ট সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ‘সর্বোচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দিয়েছে’ বলা সঠিক, কিন্তু ‘পাইককে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে হত্যা করা হয়েছে’ বলা এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত পাইকের মামলার সব আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। আদালতের সামনে থাকা জরুরি আবেদনটির বিষয় ছিল মূলত আপিল আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হবে কি না। এর ফলে টেনেসি সাজা কার্যকর করার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু পাইকের অন্যান্য আইনি দাবি নিয়ে আলাদা বিচারিক প্রক্রিয়া থাকতে পারে।
অতএব, যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল দাবিটি হলো সত্য যে মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত শেষ মুহূর্তের স্থগিতাদেশ বাতিল করে টেনেসিকে খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে তাঁকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না যাওয়া পর্যন্ত সেই দাবি প্রকাশ করা উচিত নয়। একইভাবে তিন বিচারপতির ভিন্নমত সত্য হলেও তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে খবরটিকে উপস্থাপন করার প্রয়োজন নেই।