ট্রাম্পের চোখে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’, সি চিন পিংয়ের চোখে সম্পর্কটা আসলে কেমন?

ট্রাম্পের চোখে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’, সি চিন পিংয়ের অবস্থান কী, উষ্ণ সম্পর্কের আড়ালে কি রয়ে গেছে পুরোনো কৌশলগত দ্বন্দ্ব?

ট্রাম্পের চোখে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’, সি চিন পিংয়ের চোখে সম্পর্কটা আসলে কেমন?

ট্রাম্পের চোখে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’, সি চিন পিংয়ের চোখে সম্পর্কটা আসলে কেমন?


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন একটি ছবি সামনে এসেছে। হোয়াইট হাউসে সি চিন পিংকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাদের সম্পর্ককে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সি চিন পিংয়ের বক্তব্যে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের পাশাপাশি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কৌশলগত স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়।


২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে সি চিন পিংকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানান ট্রাম্প। দুই নেতা হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন এবং পরে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেন। এ সময় দুই দেশের সম্পর্ক, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও তাইওয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসে।


সি চিন পিংকে স্বাগত জানানোর সময় ট্রাম্প বলেন, পারস্পরিক সম্মান এবং দুই দেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে সি চিন পিংয়ের ‘দারুণ বন্ধুত্ব’ গড়ে উঠেছে। ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে এবং বাণিজ্য, নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি শক্ত করতে পারে।


রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও ট্রাম্প দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে।

সি চিন পিংও বৈঠকে ইতিবাচক সম্পর্কের বার্তা দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়াকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেন। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় তৈরির আহ্বানও জানান তিনি।

তবে সি চিন পিংয়ের বক্তব্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্থিতিশীলতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নিতে হবে যেখানে সহযোগিতা হবে প্রধান বিষয়, প্রতিযোগিতা থাকবে উপযুক্ত সীমার মধ্যে এবং মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

দুই নেতার বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুও গুরুত্ব পেয়েছে। সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতায় নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাইওয়ান প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গা।

ব্যক্তিগত সৌজন্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ বক্তব্যের পরও এই ইস্যুতে দুই দেশের মৌলিক অবস্থানের পার্থক্য বহাল রয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আলোচনার পর দুই পক্ষ বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমাতে বিদ্যমান সমঝোতার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধির আশঙ্কা কমেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি, বাজার প্রবেশাধিকার এবং কৌশলগত পণ্যের বাণিজ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো রয়েছে।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও দুই নেতার আলোচনায় সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা দুটো বিষয়ই উঠে এসেছে। ট্রাম্প প্রযুক্তি ও এআই নিয়ে দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। অন্যদিকে সি চিন পিং এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানব নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি। একই সঙ্গে এআই, উন্নত প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে এবারের বৈঠকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা যেমন দেখা গেছে, তেমনি পুরোনো মতপার্থক্যগুলোর অস্তিত্বও স্পষ্ট হয়েছে।


এবারের বৈঠককে দুই দেশের সব বিরোধের সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং যোগাযোগ অব্যাহত রেখে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলোতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ট্রাম্পের ভাষায় সম্পর্কটি ‘দারুণ বন্ধুত্বের’, কিন্তু সি চিন পিংয়ের বক্তব্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা।

ফলে ওয়াশিংটনে দুই নেতার মধ্যে উষ্ণতা দৃশ্যমান হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জাতীয় স্বার্থের প্রতিযোগিতা এখনো বহাল। এবারের বৈঠক সেই প্রতিযোগিতা শেষ করেনি; বরং তা সামলানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সমঝোতার পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর