ইরান যুদ্ধের চাপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ঘাটতি, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে ভোট

ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ, সিনেটে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, একই সময়ে অর্থনীতিতে বাড়ল চলতি হিসাবের ঘাটতি ২৪৬ বিলিয়ন ডলারে।

PostImage

ইরান যুদ্ধের চাপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ঘাটতি, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে ভোট


ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই দেশটির অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। একদিকে মার্কিন সিনেটে ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে ২৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশে রয়েছে। 

২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটে ইরান যুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে আনা প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধ করা। সিনেটের সরকারি ভোটের হিসাবে প্রস্তাবটি ৪৯-৫০ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। 

রয়টার্স জানিয়েছে, অধিকাংশ রিপাবলিকান সিনেটর প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর—সুসান কলিন্স, লিসা মারকোস্কি, র‍্যান্ড পল ও থম টিলিস—প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে জন ফেটারম্যান ছিলেন একমাত্র ডেমোক্র্যাট সিনেটর যিনি এর বিপক্ষে ভোট দেন। 

প্রস্তাবটি হেরে যাওয়ায় ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান অব্যাহত থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ভোটটি কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। 

ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও। সাম্প্রতিক মার্কিন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে জ্বালানির দাম ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। 

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক লেনদেনের নতুন হিসাব প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অধীন ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস বা বিইএ। সংস্থাটির ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ২৪৬ বিলিয়ন ডলার। প্রথম প্রান্তিকে সংশোধিত ঘাটতি ছিল ২১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে ঘাটতি বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। 

বিইএর হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকের এই ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মূল্যের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে এই অনুপাত ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বৃদ্ধি। তবে বিদেশ থেকে অর্জিত আয় এবং অন্যান্য আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক ঘাটতি বৃদ্ধির মাত্রা কিছুটা সীমিত হয়েছে। 

দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবা রপ্তানি এবং বিদেশ থেকে পাওয়া আয় বেড়ে মোট ১ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বিদেশ থেকে পণ্য ও সেবা আমদানি এবং বিদেশে দেওয়া আয় বেড়ে ১ দশমিক ৬৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে রপ্তানির তুলনায় আমদানি ও বিদেশে অর্থপ্রবাহ বেশি থাকায় চলতি হিসাবে ঘাটতি আরও বেড়েছে। 

বিইএর তথ্য আরও বলছে, জুন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নিট আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অবস্থান ঋণাত্মক ২২ দশমিক ৪২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে মার্কিন বাসিন্দা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের সম্পদের পরিমাণ বেশি। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সর্বশেষ হিসাবেও ধীরগতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিইএর দ্বিতীয় প্রান্তিকের দ্বিতীয় হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন সময়ে দেশটির প্রকৃত জিডিপি বার্ষিক হিসাবে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। 

বিইএ জানিয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিতে ভোক্তা ব্যয়, রপ্তানি ও বিনিয়োগ অবদান রেখেছে। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় কমেছে এবং আমদানি বেড়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যক্তিগত অভ্যন্তরীণ ক্রেতাদের জন্য প্রকৃত চূড়ান্ত বিক্রয় ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে জিডিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মূল্যসূচকও বেড়েছে। 

ফলে সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনীতি এখনও প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে, কিন্তু বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনে চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সামরিক ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে অর্থনীতির এই পরিসংখ্যানগুলোকে সরাসরি শুধু ইরান যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চলতি হিসাবের ঘাটতি মূলত পণ্য বাণিজ্যসহ আন্তর্জাতিক লেনদেনের বিভিন্ন পরিবর্তনের ফল, আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ, রপ্তানি, সরকারি ব্যয় ও আমদানিসহ একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন এবং মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি—তিনটি বিষয়ই এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবারের সিনেট ভোটে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলেও ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে কংগ্রেসে বিতর্ক অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর