নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে বিশাল বিক্ষোভে সুসান সারানডনসহ শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার

নিউ ইয়র্কে নেতানিয়াহুর জাতিসংঘের ভাষণের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারানডনসহ শতাধিক ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে বিশাল বিক্ষোভে সুসান সারানডনসহ শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার

নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে বিশাল বিক্ষোভে সুসান সারানডনসহ শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার


যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির রাজপথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সফর ও যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে আসা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবাদে ম্যানহাটনের প্রাণকেন্দ্রে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শান্তিপুর্ণভাবে আয়োজিত বিশাল এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশ চড়াও হয়ে অস্কারজয়ী প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুসান সারানডন এবং একাধিক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচিত মুখসহ ১০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।  


যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ডেইলি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর মিডটাউন ম্যানহাটনে আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের স্থানে নেতানিয়াহুর উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী নাগরিক ও মার্কিন মানবাধিকার কর্মীরা রাজপথে অবস্থান নেন। তারা গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানান। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা ইসরায়েলকে সব ধরনের মার্কিন সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান।  


বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্লাকার্ড ও ব্যানার হাতে নিয়ে স্লোগান দেন, যার মধ্যে লেখা ছিল "ফিলিস্তিন মুক্ত কর", "ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ কর" এবং "গণহত্যা বন্ধ কর"। ম্যানহাটনের সড়কগুলোতে শত শত মানুষ বসে পড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং মধ্য ম্যানহাটনের স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে গান গেয়ে এবং স্লোগান দিয়ে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাতে থাকেন।  


বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের সদস্যরা সড়কগুলো সচল করতে বিক্ষোভকারীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তবে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান না ছাড়ায় পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয় এবং অনেককে আটক করতে শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ অন্তত ১০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।  
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলেন হলিউডের অস্কারজয়ী প্রখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী সুসান সারানডন। দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও বিশ্বশান্তির পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলে আসছেন। শুধু সুসান সারানডনই নন, গ্রেপ্তার হওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র তারকা এলিয়ট পেজ, জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার, এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক হুইসেলব্লোয়ার চেলসি ম্যানিং।  


হলিউড তারকা ও সামাজিক কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সিটি কাউন্সিল সদস্য চি ওসে এবং কাউন্সিলর অ্যালেক্সা অ্যালাইভসের মতো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সংস্কৃতি অঙ্গনের এত বড় বড় তারকাদের একসাথে গ্রেপ্তার হওয়া মার্কিন সরকারের ইসরায়েল নীতির ওপর এক বিশাল সামাজিক চাপের প্রতীক।  
নিউ ইয়র্কে আয়োজিত আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ অধিবেশনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আগমনকে কেন্দ্র করে সেখানে ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা যখন বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য একত্রিত হচ্ছেন, ঠিক তখন সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলছেন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।  


উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য রাখার জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সুযোগ দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এবং মানবাধিকার ক্ষুণ্ণকারী কোনো রাষ্ট্রনেতার জন্য জাতিসংঘে লাল গালিচা সংবর্ধনা গ্রহণযোগ্য নয়।  
গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিনেত্রী সুসান সারানডন ও অন্য অধিকারকর্মীদের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জনজীবনে বিঘ্ন ঘটানো এবং নির্দেশ অমান্য করার অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এই গ্রেপ্তারের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর পুলিশি চড়াও হওয়ার ঘটনাকে বাকস্বাধীনতা দমনের প্রচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছে।
পরবর্তীতে স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিশ্চিত করেছে যে শান্তিকামী আন্দোলনের এ কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখা যাবে না এবং সামনের দিনগুলোতে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্ক সহ গোটা বিশ্বজুড়ে তাদের এই অহিংস আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর