নারীর নেতৃত্ব প্রান্তিক নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকা উচিত: ড. খালিলুর রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ‘নারী নেতাদের মঞ্চ’-এ নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিশ্ব তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারীরা নেতৃত্বে থাকেন। একই সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
নারীর নেতৃত্ব প্রান্তিক নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকা উচিত: ড. খালিলুর রহমান
নারীর নেতৃত্ব নিয়ে জাতিসংঘে ড. খালিলুরের বার্তা
“নারীরা নেতৃত্ব দিলে বিশ্ব এগিয়ে যায়”—এই বার্তা সামনে রেখে নারীর নেতৃত্বে বৈশ্বিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন ড. খালিলুর রহমান।
২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের প্রতি সাতটি দেশের মধ্যে ছয়টি দেশ এখনও পুরুষ নেতৃত্বাধীন। আর ২০২৫ সালে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া আলোচকদের মাত্র ৫ শতাংশ ছিলেন নারী।
ড. খালিলুর রহমানের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল অঙ্গীকার এবং বাস্তবতার মধ্যকার এই ব্যবধান কমানো। তাঁর মতে, নারীর নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তিক অবস্থান থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রশ্নটি শুধু প্রতিনিধিত্বের বিষয় নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংঘাত নিরসন, উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণেও নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক দীর্ঘদিনের আলোচনাতেও শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ ও জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি
এবারের ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে নিউইয়র্কে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অধিবেশনের উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের স্বাগত প্রাতরাশেও তাঁরা অংশ নেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ড. খালিলুর রহমান। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে অধিবেশনের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের উপস্থিতিতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, অন্যদিকে নারী নেতৃত্ব, নারীর অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমতার মতো বৈশ্বিক বিষয়ও সামনে এসেছে।
প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের প্রশ্ন
বিশ্বজুড়ে নারী নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়ে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনের সব পর্যায়ে নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সমান সুযোগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনও সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতের সময় শান্তি আলোচনার টেবিলে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অতীতের জাতিসংঘের তথ্য ও আলোচনাতেও দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সীমিত ছিল।এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই ড. খালিলুর রহমানের বক্তব্যে ‘অঙ্গীকার’-এর পাশাপাশি ‘বাস্তবতা’র বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সিদ্ধান্তের টেবিলে নারীর অংশগ্রহণ
নারীর নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এখন শুধু নারী কতজন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, সেই সংখ্যার প্রশ্নই নয়। তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা কার্যকর, নীতিনির্ধারণে তাঁদের মতামত কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে এবং শান্তি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁদের ভূমিকা কতটা অর্থবহ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায়ও এই অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ড. খালিলুর রহমানের বক্তব্য সেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক আলোচনাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বার্তা স্পষ্ট—নারী নেতৃত্বকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।