ফিলিস্তিনিদের জন্য কানাডার নতুন ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা, গাজায় মানবিক ত্রাণ জোরদার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন সহায়তা ঘোষণা করেছে কানাডা, যার বড় অংশ যাবে গাজার জরুরি মানবিক ত্রাণে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য কানাডার নতুন ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা, গাজায় মানবিক ত্রাণ জোরদার

ফিলিস্তিনিদের জন্য কানাডার নতুন ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা, গাজায় মানবিক ত্রাণ জোরদার


ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন করে ১০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা ঘোষণা করেছে কানাডা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ২২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই ঘোষণা দেন। কানাডার ঘোষিত নতুন প্যাকেজের বড় অংশ ৮০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মানবিক সহায়তায় ব্যয় করা হবে। বাকি ২০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার শান্তি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে ব্যবহারের কথা জানিয়েছে অটোয়া। 

কানাডার এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর মানবিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়, পানি ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে কানাডার নতুন অর্থায়নের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ কমানো।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্নি জাতিসংঘে সাংবাদিকদের জানান, নতুন তহবিলের ৮ কোটি কানাডিয়ান ডলার সরাসরি মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যে দেওয়া হবে। এর লক্ষ্য তাৎক্ষণিক মানবিক দুর্ভোগ লাঘব করা। অপরদিকে ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার শান্তি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে যাবে। 

এই দ্বিতীয় অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে। কানাডার দীর্ঘমেয়াদি একটি কর্মসূচির আওতায় পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পুলিশের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। অর্থাৎ পুরো ১০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার-কে কেবল জরুরি খাদ্য বা চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে দেখলে ঘোষণাটির প্রকৃত কাঠামো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। 

কানাডার ঘোষণাটি দেশটির বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে অটোয়া ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থনের কথা জোর দিয়ে বলেছে। কানাডার নতুন অর্থায়নকে সেই রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “কানাডা ফিলিস্তিনকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে” কথাটি এমনভাবে ছড়াতে পারে, যেন এটি কানাডার পক্ষ থেকে একবারে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নগদ অর্থ সরাসরি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি সঠিক ব্যাখ্যা নয়।

প্রথমত, ঘোষিত অর্থের মুদ্রা কানাডিয়ান ডলার। দ্বিতীয়ত, পুরো অর্থ মানবিক ত্রাণ নয়। মোট ১০ কোটি কানাডিয়ান ডলার-এর মধ্যে ৮ কোটি কানাডিয়ান ডলার মানবিক সহায়তা এবং ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার শান্তি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত। 

কানাডা এর আগেও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবিক সহায়তা দিয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে কানাডা জানিয়েছিল যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে পশ্চিম তীর ও গাজার জন্য মোট ১০৪.৫ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বিভিন্ন ধাপে অর্থায়নও ছিল। 

এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুনেও কানাডা গাজা ও পশ্চিম তীরের বেসামরিক জনগণের জন্য আরও ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার জরুরি মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছিল। ওই অর্থ জাতিসংঘ, রেড ক্রস এবং বেসরকারি সংস্থার অংশীদারদের মাধ্যমে দেওয়ার কথা জানানো হয়। কানাডা তখন বলেছিল, এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য দেশটির মোট মানবিক সহায়তা অর্ধ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি হয়েছে। 

তাই সেপ্টেম্বরের নতুন ঘোষণাকে কানাডার আরেকটি নতুন ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার সহায়তা প্যাকেজ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আগের অর্থায়নের পুনরাবৃত্তি হিসেবে নয়। একই সঙ্গে কানাডার দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পরিমাণ বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ফিলিস্তিনিদের জন্য অটোয়ার আর্থিক সম্পৃক্ততা একাধিক ধাপে বিস্তৃত হয়েছে।

কানাডার এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিন ইস্যু যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য, তখন নতুন সহায়তা ঘোষণা করে কানাডা মানবিক সংকট মোকাবিলায় নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে। একই সময়ে দেশটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে। 

কার্নি একই প্রেক্ষাপটে গাজায় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে এনেছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও হামাস-সংক্রান্ত উদ্বেগও কানাডার বক্তব্যে উঠে এসেছে। ফলে অটোয়ার অবস্থানকে শুধু মানবিক সহায়তা হিসেবে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

কানাডার ফিলিস্তিনের জন্য ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার নতুন সহায়তার ঘোষণা সত্য। এর ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার তাৎক্ষণিক মানবিক প্রয়োজন মেটাতে এবং ২ কোটি কানাডিয়ান ডলার শান্তি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ঘোষণাটি ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সময় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দিয়েছেন। 

অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল দাবিটি সত্য হলেও, সঠিক তথ্য হলো এটি ১০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের নতুন আন্তর্জাতিক সহায়তা প্যাকেজ, যার পুরোটা সরাসরি নগদ ত্রাণ নয় এবং যার বড় অংশ মানবিক সহায়তায় ব্যবহৃত হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর