জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বহু পাক্ষিক ব্যবস্থার জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে আন্তোনিও গুতেরেস কথা বলছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বহু পাক্ষিক ব্যবস্থার জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বহু পাক্ষিক ব্যবস্থার জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন


বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই যুগে বিশ্ব ব্যবস্থার নতুন রূপরেখা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এখন একটি বহুমুখী বা বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে, যেখানে কেবল একটি বা দুটি দেশের আধিপত্য নয়, বরং সব দেশের সমান অংশীদারিত্ব বজায় রাখার দাবি উঠছে। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বিশ্বব্যবস্থা যত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাক না কেন, আন্তর্জাতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে জাতিসংঘকে রেখেই কাজ করতে হবে।  


জাতিসংঘের প্রধান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যেখানে একটি দেশের একচ্ছত্র প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে এবং বিশ্ব দ্রুত বহুমুখী শক্তির ভারসাম্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পরিবর্তনকে আরও সুসংগঠিত এবং কার্যকরী করতে একটি শক্তিশালী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা বজায় রাখা অপরিহার্য। অন্যথায়, একটি নিয়মবিহীন বিশ্বব্যবস্থা কেবল সংঘাত ও বৈষম্য বৃদ্ধি করবে। তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা জাতিসংঘের মূল সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। 

 
বিশ্বজুড়ে চলমান বেশ কিছু সামরিক ও মানবিক সংকট নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ প্রধান। গাজা উপত্যকায় সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক সংকট, ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ এবং সুদানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের মানবিক বিপর্যয় বিশ্বশান্তির জন্য চরম হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন সব দেশেরই উচিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং যে কোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা। সামরিক পথ কোনো টেকসই সমাধান আনতে পারে না, কেবল আলোচনার মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।  


আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সার্বিক সংস্কারের বিষয়েও জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের প্রধান। বৈশ্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তিনি ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলির দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য সেখানেও কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা বর্তমানে উন্নত দেশের পক্ষে বেশি কাজ করছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ হস্তান্তর, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।  


সংকটকালে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে তা দূরীকরণে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে বহু মতামত রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সহজীকরণ নিশ্চিত না হলে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্য ও অনাহারের চরম ঝুঁকিতে পড়বে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে তথ্যপ্রযুক্তির সুফল যেন সব দেশ সমানভাবে উপভোগ করতে পারে এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর হয়, তার ওপরও জোর দেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।  


জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো। এর সমাধানে ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে জলবায়ু তহবিল গঠন এবং তা সঠিক সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মহাসচিব স্পষ্ট করেন, আমাদের বিশ্ব এখন যে সমস্ত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, তার সমাধান এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রতিটি রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থেকে কাজ করতে হবে। সকল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আকাশ ও জলসীমার নির্বিঘ্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

  
বিশ্বনেতাদের উচিত সংঘাতের পথ পরিহার করে স্থায়ী শান্তির জন্য একসাথে এগিয়ে আসা। জাতিসংঘের নেতৃত্বের অধীনে একটি দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যা কাটিয়ে উঠে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর