ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার যে কোনো চক্রান্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করল আটটি মুসলিম দেশ

গাজায় যুদ্ধবিরতি রক্ষা, ত্রাণ নিশ্চিতকরণ ও ফিলিস্তিনিদের স্থায়ী উচ্ছেদ বন্ধে একাট্টা হয়ে নিউ ইয়র্কে যৌথ ঘোষণা দিল আট প্রভাবশালী মুসলিম দেশ।

ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার যে কোনো চক্রান্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করল আটটি মুসলিম দেশ

ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার যে কোনো চক্রান্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করল আটটি মুসলিম দেশ


ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনো চক্রান্ত বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বিশ্বের আটটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশ। পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের জলসার ফাঁকে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়ে এই সংক্রান্ত এক যৌথ বিবৃতি জারি করেন। এই যৌথ বার্তায় বিশ্বনেতারা গাজায় যুদ্ধবিরতি রক্ষা, জরুরি ত্রাণ পাঠানো নিশ্চিত করা এবং কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান ও রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ওপর তাগিদ দিয়েছেন। সেই সাথে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।


আট দেশের এই উচ্চপর্যায়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিশ্বশান্তি রক্ষা, গাজার চরম মানবিক বিপর্যয় রোধ এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে যে যৌথ বার্তা পেশ করা হয়, তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে গাজাবাসীকে জোর করে অন্য কোনো দেশে বা স্থানে সরিয়ে নেওয়ার যে কোনো চক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন যে, গাজাকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার বা এর ভূখণ্ডগত ঐক্য নষ্ট করার যে কোনো প্রচেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করবেন।


মানবিক বিপর্যয় ও ত্রাণ সহায়তার ডাক:
যৌথ বিবৃতিতে আটটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গাজা উপত্যকায় অনাহার ও চিকিৎসা সংকটে থাকা লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জন্য অবিলম্বে ও নির্বিঘ্নে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী প্রবেশ করার ব্যবস্থা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দখলদার বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানান। বিশেষ করে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের চরম ঘাটতি দূর করতে সমস্ত প্রবেশপথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেছেন যে, মানবিক সহায়তা প্রদান করা কেবল একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটি জেনেভা কনভেনশন সহ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। তারা নিরাপত্তা পরিষদকে এই পরিস্থিতি সমাধানে আরও দৃঢ় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া মৌলিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। নেতারা জোর দিয়ে বলেন, গাজা ফিলিস্তিনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সাথে এর ভূখণ্ডগত ঐক্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না।


রাজনৈতিক সমাধান ও দ্বি-রাষ্ট্রীয় নীতি:
বৈঠকের আলোচনা কেবল যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আটটি দেশ স্পষ্টভাবে দ্বি-রাষ্ট্রীয় নীতি ও ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সমাধানের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার নিশ্চিত করবে। তারা কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান এবং এর রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ওপর তাগিদ দিয়েছেন, যা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করে। নেতারা সতর্ক করেছেন যে, দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখে বা ফিলিস্তিনিদের অধিকার খর্ব করে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই বিষয়ে দ্বিমুখী নীতি ও অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিনিধিরা মত ব্যক্ত করেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, "ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনো চেষ্টা আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই সংকটের একমাত্র সমাধান।"
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ:
বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) মতামতের প্রেক্ষাপটে এই আটটি দেশের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিরাপত্তা পরিষদকে গাজার মানবিক বিপর্যয় ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তারা আরব লিগ ও ওআইসি (OIC) এর সাথে সমন্বয় করে এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গাজায় দ্রুত পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি অভিন্ন কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নেতাদের মতে, এই জোটবদ্ধ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় এবং এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর