কূটনীতির আড়ালে পাকিস্তানের নতুন প্রতারণা ও বিপদে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা

বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চরম অনিশ্চয়তা ও প্রতারণার মুখে ফেলেছে পাকিস্তান সরকার।

কূটনীতির আড়ালে পাকিস্তানের নতুন প্রতারণা ও বিপদে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা

কূটনীতির আড়ালে পাকিস্তানের নতুন প্রতারণা ও বিপদে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা


দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান সবসময়ই একটি জটিল ও আলোচিত নাম। সম্প্রতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি জোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুই দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এনে যে ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে এই সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, ঐতিহাসিক প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার এক পুরানো ইতিহাস এখনো বহন করে চলেছে দেশটি।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ছলচাতুরির ইতিহাস কেবল বাংলাদেশের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চেও তাদের ভূমিকা বারবার বিতর্কিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসকারী প্রবাসী ও অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পাকিস্তানি নাগরিকদের সাধারণ মানুষ কিংবা সরকারি পর্যায় খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা, জালিয়াতি, প্রতারণা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত থাকার অভিযোগ বেশ পুরনো। একটি রাষ্ট্র যখন নিজেদের জনগণের সঙ্গেই সৎ আচরণ করতে পারে না, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এক ধরণের তৎপরতা শুরু হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকদের মনে শঙ্কা তৈরি করেছে। ইসলামাবাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রনাল্যের প্রতিনিধিরা ঢাকা সফর করেছেন। তারা পারস্পরিক সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের কথা বলছেন। কিন্তু এই কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শিক্ষা, ভ্রমণ ও চিকিৎসা খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে যৌথ সহযোগিতার নামে মূলত নতুন কিছু ফাঁদ তৈরি করা হচ্ছে। চিকিৎসার কথা বলতে গেলে, পাকিস্তানের স্বাস্থ্যখাত বৈশ্বিক মানের বিচারে অনেক পিছিয়ে। যেখানে নিজেদের দেশের নাগরিকরাই উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য দেশে যায়, সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য চুক্তির কথা হাস্যকর শোনায়।
এই নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের উদীয়মান তরুণ সমাজ। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করতে পাকিস্তান একটি শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার সুযোগ দেওয়ার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিকে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচিতে নির্বাচিত পাঁচশ শিক্ষার্থী পাবেন বিনামূল্যে টিউশন ফি, থাকার সুব্যবস্থা, মাসিক অর্থ সহায়তা এবং বিমানে আসা-যাওয়ার টিকিট। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তরুণরা যখন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়ে পাকিস্তানে পৌঁছালেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে এলো।
শিক্ষার্থীরা সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের জানানো হয় যে, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল টিউশন ফি ছাড় ও হলের আসন দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ঢাকা থেকে সেখানে যাওয়ার বিমান ভাড়া, খাবারের খরচ কিংবা প্রতিশ্রুতি দেওয়া মাসিক আর্থিক অনুদান সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। বিদেশের মাটিতে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করে আর্থিক সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই শিক্ষাবৃত্তির মৌলিক সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


সমস্যা কেবল আর্থিক সুযোগ-সুবিধাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার্থীদের তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। লাহোর কিংবা করাচির মতো বড় শহরের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা আবেদন করেছিলেন। অথচ তাদের পাঠানো হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অচেনা কিছু প্রতিষ্ঠানে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো মান বা স্বীকৃতি নেই, সেখানকার সনদ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বা দেশের বাজারে চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ধরনের দায়িত্বহীন আচরণ প্রমাণ করে যে, এই উদ্যোগগুলোর পেছনে আন্তরিকতার চেয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছিল।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ইমেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত প্রতিবাদ জানালেও কোনো ইতিবাচক উত্তর পাননি। ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তানি দূতাবাসও এই বিষয়ে পুরোপুরি নীরব ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, এই বিষয়ে তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। বিদেশের মাটিতে নিজেদের দেশের তরুণরা যখন এভাবে জালিয়াতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তখন দায়িত্বশীলদের এমন নীরবতা অত্যন্ত হতাশাজনক।


পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই সংকটময়। দেশে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জঙ্গি তৎপরতার খবর নিয়মিত শিরোনাম হয়। একটি দেশ যখন নিজের অভ্যন্তরীণ সংকট সামলাতে ব্যর্থ, তখন সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ও মেধা বিনিয়োগ করা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ, তা নিয়ে ভেবে দেখা প্রয়োজন। তাই শিক্ষার নামে বা বন্ধুত্বের নামে সামনে আসা এই কূটনৈতিক তৎপরতাগুলোর পেছনের বাস্তবতা বোঝা দরকার। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেকোনো নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের আগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর