ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিউইয়র্কে বড় কূটনৈতিক বৈঠক, ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে ইরাক ও জর্ডানও
ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় নেতাদের বৈঠক, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ও কূটনীতি থাকবে আলোচনার কেন্দ্রে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিউইয়র্কে বড় কূটনৈতিক বৈঠক, ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে ইরাক ও জর্ডানও
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের মধ্যেই ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ মঙ্গলবার নিউইয়র্কে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিকল্পিত এই বৈঠকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছে একাধিক মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম।
অ্যাক্সিওস তিনটি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনার অন্যতম বিষয় হতে পারে ইরান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ এবং সংঘাত শেষে অঞ্চলটিতে কী ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে বৈঠকের আগে এসব পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
বৈঠকে শুধু উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় দেশই নয়, ইরাক ও জর্ডানের প্রতিনিধিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। দ্য ন্যাশনাল জানিয়েছে, মিসরের প্রতিনিধিত্বও থাকতে পারে। আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড এবং ইয়েমেনের হুতি বাহিনীকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাও গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে তাদের তৎপরতা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অভিযোগ করেছেন, ইরান হুতিদের আরও উন্নত অস্ত্র, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ; তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে আসছে।
বৈঠকটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ট্রাম্প ইরান নিয়ে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রকাশ্যে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে তিনি অ্যাক্সিওসকে জানান, ইরান প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সামনে রয়েছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না—সেই প্রশ্নও প্রকাশ্যে তুলেছেন। তবে কোনো নতুন হামলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
একই সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও থেমে নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। নিউইয়র্ক যাওয়ার পথে তিনি দোহায় কাতারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানেরও জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
গালফ নিউজ জানিয়েছে, কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন আলোচনার জন্য কয়েকটি শর্ত পাঠিয়েছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যে যুদ্ধ বন্ধ, জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় উঠে এসেছে। তবে ওয়াশিংটন এসব শর্ত মেনে নিয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পও ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে নিউইয়র্কে সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে পুরোপুরি দরজা বন্ধ করেননি। তিনি এমন একটি বৈঠকের ব্যাপারে ‘উন্মুক্ত’ থাকার কথা বলেছেন। তবে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই প্রেসিডেন্টের সরাসরি বৈঠকের কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ অভিন্ন হলেও যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল নিয়ে তাদের অবস্থান পুরোপুরি এক নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ নিউইয়র্কে বলেছেন, অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা যথেষ্ট নয়; আরব দেশ ও ইরানের মধ্যেও সরাসরি সংলাপ প্রয়োজন। তিনি সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন মানসিকতা’র আহ্বান জানিয়েছেন।
কাতারও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছে। কাতারি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো যাই হোক না কেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে তার পাশেই থাকতে হবে। তাই ভবিষ্যতে আবার বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক সংলাপ, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর ধারণা সামনে এনেছে দোহা।
এই ভিন্ন অবস্থানের কারণে আজকের বৈঠকে শুধু সামরিক কৌশল নয়, যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য পথ নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব-ইরান সরাসরি আলোচনার পক্ষে কথা বলছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি নতুন আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলেছে। এপি জানিয়েছে, সংঘাত ও আঞ্চলিক হামলাগুলো তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশকে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিতে বাধ্য করেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহেও ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে। জি-৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানের প্রতি ইয়েমেনের হুতিদের সহায়তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন আরব দেশ যুদ্ধের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।
ফলে আজকের ট্রাম্প-উপসাগরীয় বৈঠক থেকে অবিলম্বে কোনো শান্তিচুক্তি বা সামরিক সিদ্ধান্ত আসবে—এমনটি এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ইরান নীতি, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।