অস্ত্রবাহী ড্রোন উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়াতে কার্বন ফাইবার তৈরির কারখানা সম্প্রসারণ করছে রাশিয়া

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ড্রোন উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, যেখানে সামরিক প্রযুক্তি বৃদ্ধির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অস্ত্রবাহী ড্রোন উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়াতে কার্বন ফাইবার তৈরির কারখানা সম্প্রসারণ করছে রাশিয়া

অস্ত্রবাহী ড্রোন উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়াতে কার্বন ফাইবার তৈরির কারখানা সম্প্রসারণ করছে রাশিয়া


ইউক্রেনে চলমান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও দূরপাল্লার হামলার আক্রমণাত্মক জোর বাড়াতে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। রাশিয়ার পরমাণু শক্তিবিষয়ক রাষ্ট্রীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠান 'রোসাটম'-এর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পলিটিকো জানিয়েছে, রাশিয়া তাদের ড্রোন তৈরির মূল কাঁচামাল উৎপাদনের গতি নজিরবিহীনভাবে বাড়াতে যাচ্ছে।  


পলিটিকোর হাতে আসা গোপন নথিপত্র ও পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়ার তাতারস্তান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত রোসাটমের নিয়ন্ত্রণাধীন 'আলাবুগা-ভলোকনো' ফাইবার উৎপাদন কারখানাটির ব্যাপ্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হবে। এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৫০০ টন সামরিক মানের মহাকাশ ও অ্যারোস্পেস উপযোগী অত্যন্ত উচ্চমানের কার্বন ফাইবার উৎপাদন করা।  


আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতে, বিশেষ করে দূরপাল্লার আত্মঘাতী এবং বিধ্বংসী ড্রোন তৈরিতে কার্বন ফাইবার এক অপরিহার্য উপাদান। এই উপাদানটি অত্যন্ত হালকা হওয়ার পাশাপাশি ধাতুর চেয়েও বহু গুণ বেশি শক্ত ও টেকসই। হালকা হওয়ার কারণে কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি ড্রোনগুলো অনেক বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং জ্বালানি সাশ্রয় করে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। বর্তমান আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে এই উপাদানের ব্যবহার ড্রোনের কার্যক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। 

 
সামরিক বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তবিদদের হিসাব অনুযায়ী, বছরে অতিরিক্ত ৫০০ টন কার্বন ফাইবার দিয়ে রাশিয়া প্রতি বছর নতুন করে আরও অন্তত ২৮ হাজার অস্ত্রবাহী ও আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করতে পারবে। এর ফলে রাশিয়ার বর্তমান অস্ত্রবাহী ড্রোন উৎপাদনের সামগ্রিক সক্ষমতা রাতারাতি প্রায় ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর আগে রাশিয়া শাহেদ সিরিজের নকশায় স্থানীয়ভাবে ড্রোন তৈরি করে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। নতুন এই কারখানা সম্প্রসারণের ফলে রাশিয়ার ড্রোন তৈরির নিজস্ব সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং বিদেশি যন্ত্রাংশ বা সরবরাহের ওপর তাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।  
পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মস্কো কীভাবে সামরিক শিল্পের বিকাশ ঘটাচ্ছে, এই পরিকল্পনা তার এক বড় প্রমাণ। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাশিয়া এখন সর্বাধুনিক ড্রোনের গণউৎপাদনে মনোযোগ দিচ্ছে। দেশটির তাতারস্তান অঞ্চলে গড়ে তোলা বিশেষ প্রযুক্তি এলাকাটি ইতিমধ্যেই রাশিয়ার সামরিক ড্রোন তৈরির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পলিটিকো আরও জানায়, কারখানা সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং প্রযুক্তিবিদদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। 

 
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লড়াইয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। কার্বন ফাইবারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল দেশীয় কারখানায় বিপুল পরিমাণে তৈরি করতে পারলে তা সামরিক ড্রোন শিল্পের পাশাপাশি রাশিয়ার বিমান ও মহাকাশ শিল্পকেও নতুন শক্তি জোগাবে। ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে ভবিষ্যতে রুশ ড্রোনের ব্যবহার এবং আক্রমণের তীব্রতা বহু গুণে বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। রোসাটমের এই বর্ধিত কারখানা প্রকল্প চালু হলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর