অপ্রতিমের বাবার ব্যবসার ডেলিভারিম্যান হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি ফাহাদ

কুমিল্লায় আইফোন ছিনতাই ও পাঁচ হাজার টাকা দেনা শোধ এড়াতে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া দোকানের ডেলিভারিম্যান ফাহাদসহ আটক চার।

অপ্রতিমের বাবার ব্যবসার ডেলিভারিম্যান হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি ফাহাদ

অপ্রতিমের বাবার ব্যবসার ডেলিভারিম্যান হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি ফাহাদ


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষক দম্পতির সন্তান ও ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাথমিক তদন্ত ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, মূলত একটি দামী আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেছে। নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। এই নির্মম ঘটনায় পুরো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং লালমাই অঞ্চলে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে 'ইয়েসটেক' নামে একটি মোবাইল যন্ত্রাংশ বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ সম্প্রতি ওই দোকানে মাসে ১৪ হাজার টাকা বেতনে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ শুরু করে। ফাহাদের অটোচালক বাবার অনুরোধে তাকে এই কাজ দেওয়া হয়েছিল। তবে দুই সপ্তাহ পার হলেও তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তিপত্র সম্পন্ন হয়নি। ঘটনার দিন শুক্রবার জুমা পড়ার পর বাসায় ফিরে পরিবারের সঙ্গে খাবার খায় অপ্রতিম। এরপর বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে মোবাইল ফোনে মেসেজ পেয়ে সে আইফোন নিয়ে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাকে ডেকে নিয়ে যায় এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিন।


তদন্তকারীদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তির সহায়তায় দেখা গেছে, শুক্রবার বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন ও জঙ্গলঘেরা স্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেখানে তার সঙ্গী ফাহাদ এবং কামরুল হাসানও যোগ দেয়। নির্জন বনে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হলে সে শক্ত বাধা দেয়। এতে আসামিদের সঙ্গে তার তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মূল পরিকল্পনাকারী তুহিন একটি শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় প্রথম আঘাত করে। এরপর ফাহাদ এবং কামরুলও পর্যায়ক্রমে বাঁশ দিয়ে অপ্রতিমকে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। অতিরিক্ত আঘাতে ঘটনাস্থলেই শিশু অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা তার হাতের আইফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।


এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও অপ্রতিম ঘরে না ফেরায় তার পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অপ্রতিমের বাবা তখন তাদের দোকানের কর্মচারী ফাহাদকে ডেকে এনে ছেলেকে খুঁজে বের করতে বলেন। ফাহাদ তাদের সঙ্গে অনুসন্ধানে অংশ নেওয়ার ভান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দলে অপ্রতিমের নিখোঁজ সংবাদ ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং মায়ের সহকর্মীরা ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ফেলেছিলেন। ফুটেজে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমকে দেখা গেলে ফাহাদ তুহিনকে চিনে ফেলে এবং তাদের পরিবারের সামনেই তুহিনকে ফোন করার নাটক করে। তখন ফোনে তুহিন দাবি করে যে অপ্রতিম তার কাছে আসেনি। অথচ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় অপ্রতিমকে হত্যা করে লাশ বনে ফেলে আসা হয়েছিল।


পরদিন শনিবার সকালে প্রধান আসামি তুহিন ও তার বন্ধু সিয়াম মোটরসাইকেলে চড়ে অপ্রতিমদের বাসায় এসে উপস্থিত হয় এবং পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের ভান করে। দুপুরে লালমাই পাহাড় থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া মাত্রই আসামি ফাহাদ অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে স্থান ত্যাগ করে সটান সটে পড়ে। লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশ দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে তুহিনকে আটক করে। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে পুরো ঘটনার কথা স্বীকার করে এবং তার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে নিহত অপ্রতিমের হাত থেকে ছিনতাই হওয়া আইফোনটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এরপর একে একে ফাহাদ, কামরুল এবং সিয়ামকে আটক করা হয়।


সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা জেলা পুলিশ প্রধান জানান, আইফোন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ফাহাদের সঙ্গে অপ্রতিমের পাঁচ হাজার টাকার একটি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের সূত্রও মিলেছে। ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল এবং অপ্রতিম সম্প্রতি সেই টাকা ফেরত চাইলে ফাহাদ তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তুহিনের বয়স ১৯ বছর, ফাহাদের ১৫ বছর, কামরুলের ১৬ বছর এবং সিয়ামের ১৯ বছর। তাদের মধ্যে বয়স কম হওয়ার কারণে ফাহাদ ও কামরুলকে গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আসামিরা সবাই এলাকার বখাটে এবং পড়াশোনায় অনিয়মিত অথবা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর