জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণ ফের আলোচনায়, বাংলাদেশ থেকে গাজা-রোহিঙ্গা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন নানা সংকট
জাতিসংঘে ড. ইউনূসের পুরোনো ভাষণ ফের আলোচনায়, বাংলাদেশ সংস্কার থেকে গাজা-রোহিঙ্গা ও জলবায়ু সংকট নিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণ ফের আলোচনায়, বাংলাদেশ থেকে গাজা-রোহিঙ্গা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন নানা সংকট
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া ভাষণের একটি ভিডিও নতুন করে প্রকাশ করেছে দৈনিক যুগান্তর। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে ‘জাতিসংঘে বক্তব্য রাখলেন ড. ইউনূস’ শিরোনামে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। তবে ভিডিওটি চলমান ৮১তম সাধারণ পরিষদে দেওয়া নতুন কোনো ভাষণ নয়। জাতিসংঘের নিজস্ব রেকর্ড অনুযায়ী, এটি ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৮০তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের দেওয়া ভাষণ।
জাতিসংঘের সেই মঞ্চে ড. ইউনূস বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনীতি, নির্বাচন, তরুণদের ভূমিকা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, গাজা, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, শান্তিরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার—বিস্তৃত বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী তাঁর বক্তব্য প্রায় ৪৩ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।
ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন ড. ইউনূস। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকীর প্রসঙ্গ তুলে তিনি তরুণদের ভূমিকার কথা বলেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচন, সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের বিষয়ও আসে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা সহজ করা, বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নতির কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্ব উল্লেখ করে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশের প্রতি আহ্বান জানান।
তরুণদের প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ উদ্ভাবনে তাদের দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও তুলে ধরেন।
ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট ছিল বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু। ড. ইউনূস রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সময়সীমাভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক রোডম্যাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও উন্নত বিশ্বের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন যথাযথভাবে না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিল পুরোপুরি কার্যকর করার আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে।
ড. ইউনূসের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ছিল গাজা ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি। তিনি গাজায় শিশু ও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, ক্ষুধা এবং হাসপাতাল ও স্কুলসহ অবকাঠামোর ধ্বংসের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের গণহত্যাসংক্রান্ত মূল্যায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের একমত হওয়ার কথা জানান এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ১৯৬৭-পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো পুনরুজ্জীবিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকারও সমর্থন করেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের কথাও ভাষণে উঠে আসে। ড. ইউনূস বলেন, সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী দেশ। তিনি শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দায়িত্ব, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভুয়া তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। এআই ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য মানুষের মধ্যে আস্থা নষ্ট এবং সামাজিক সম্প্রীতি দুর্বল করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
তবে বর্তমানে নিউইয়র্কে চলমান ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, বিশ্ব শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার কথা রয়েছে।