আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পুরো ব্যবস্থাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পুরো ব্যবস্থায় ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পুরো ব্যবস্থাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার পথে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রস্তুতি নিয়েছে। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে আদালতের আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তিসেবা, কর্মীদের বেতন পরিশোধ এবং তদন্ত পরিচালনার মতো দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্স ২০ সেপ্টেম্বর দুই সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন পুরো আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং শিগগিরই তা ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ঠিক কবে ঘোষণা আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনের সময় অথবা এর কিছুদিন পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। রয়টার্স অবশ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের সব বিস্তারিত স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তুলনায় অনেক বিস্তৃত। এতদিন ওয়াশিংটন আইসিসির নির্দিষ্ট বিচারক, কৌঁসুলি ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নতুন পরিকল্পনায় ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তে আদালত প্রতিষ্ঠানটিকেই সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আগে ছয় থেকে সাত মাসের একটি অন্তর্বর্তী সময় দেওয়া হতে পারে। এরপর আইসিসির সঙ্গে অধিকাংশ আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ হতে পারে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান আদালতকে অর্থ, পণ্য কিংবা সেবা দিতে পারবে না—এমন ব্যবস্থাও পরিকল্পনার অংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ঝুঁকি এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান আইসিসির সঙ্গে লেনদেন সীমিত বা বন্ধ করতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আদালতের তথ্যপ্রযুক্তি ও বিমাসেবা কেনা, তদন্তকারী নিয়োগ এবং নিয়মিত আর্থিক লেনদেন—এমনকি মার্কিন কর্মীদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটন ও আইসিসির বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ইসরায়েল-গাজা সংঘাত। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ইসরায়েল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আদালতের এখতিয়ারও মানে না। যুক্তরাষ্ট্রও এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—কোনোটিই আইসিসির সদস্য নয়।
তবে আইসিসির অবস্থান হলো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো অ-সদস্যরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও আদালতের এখতিয়ার থাকতে পারে। এখতিয়ার নিয়ে এই আইনি প্রশ্নেই যুক্তরাষ্ট্র ও আদালতের মধ্যে মৌলিক মতবিরোধ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসির পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। গত ১৮ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। এটি মার্কিন প্রশাসনের নিজস্ব অবস্থান; আইসিসি ও আদালতটির সমর্থক দেশগুলো এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তি শুধু ইসরায়েল-সংক্রান্ত মামলায় সীমাবদ্ধ নয়। আফগানিস্তানে সংঘটিত কথিত অপরাধ নিয়ে আইসিসির অতীত তদন্তে মার্কিন নাগরিক ও সেনাসদস্যদের সম্ভাব্য তদন্তের বিষয়েও ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আপত্তি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০২ সালে কার্যক্রম শুরু করে। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধের জন্য ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনাই এর মূল উদ্দেশ্য। সাধারণভাবে কোনো রাষ্ট্র নিজে প্রকৃতভাবে তদন্ত বা বিচার করতে অক্ষম কিংবা অনিচ্ছুক হলে আদালত তার এখতিয়ারের মধ্যে থাকা মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই রোম সংবিধির পক্ষরাষ্ট্র হয়ে আইসিসিতে যোগ দেয়নি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত কাঠামো কী হয়। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো আদালতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে, কিন্তু এর সব শর্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে কোন লেনদেন নিষিদ্ধ হবে, কী কী ব্যতিক্রম থাকবে এবং কখন থেকে ব্যবস্থা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা রয়েছে।