ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.৪৮ ডলার, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপের মুখে পড়েছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা এখন।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এক গ্যালন সাধারণ পেট্রলের জাতীয় গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.৪৮ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই পেট্রলের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। এএএ জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর এক গ্যালন সাধারণ পেট্রলের জাতীয় গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪.৪৩ ডলার। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় তা প্রায় ১৬ সেন্ট বেশি এবং এক বছর আগের তুলনায় এক ডলারেরও বেশি বেশি। ২০ সেপ্টেম্বর সেই গড় আরও বেড়ে প্রায় ৪.৪৮ ডলারে পৌঁছেছে।
বর্তমান দাম চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়েরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এএএ-এর হিসাবে, গত ২১ মে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রলের জাতীয় গড় মূল্য ৪.৫৬ ডলারে উঠেছিল। তবে দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ জাতীয় গড় মূল্য ছিল ২০২২ সালের ১৪ জুনের ৫.০১ ডলার।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অপরিশোধিত তেলের দামকে বড় কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে এএএ। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের আশপাশে ছিল। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, পেট্রলের বাড়তি খরচ বিশেষ করে কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
কাজে যাতায়াতের জন্য যাদের প্রতিদিন গাড়ি ব্যবহার করতে হয়, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। টেক্সাসে অ্যামাজনের একজন ডেলিভারি চালক এপিকে জানান, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। মিশিগানে ছোট ব্যবসা পরিচালনাকারী আরেক ব্যক্তি জানান, একাধিক পেট্রলচালিত গাড়ি ও ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য সরাসরি তার ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে।
দামের প্রভাব অবশ্য সব অঙ্গরাজ্যে সমান নয়। ১৭ সেপ্টেম্বরের এএএ হিসাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক গ্যালন সাধারণ পেট্রলের গড় দাম ছিল ৬.০৮ ডলার, ওয়াশিংটনে ৫.৫৭ ডলার এবং হাওয়াইয়ে ৫.৪৮ ডলার। বিপরীতে ইন্ডিয়ানা ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যে দাম তুলনামূলক কম ছিল—প্রায় ৩.৯২ ও ৩.৯৩ ডলার।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোট ইতোমধ্যে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে শুরু হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয় নির্বাচনী আলোচনায় রয়েছে।
এপির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সাম্প্রতিক ফক্স নিউজ জরিপে ৬১ শতাংশ ভোটার বলেছেন, পেট্রলের দাম তাদের পরিবারের জন্য একটি বড় সমস্যা। দুই বছর আগে একই কথা বলেছিলেন ৪৮ শতাংশ। জরিপটি ইঙ্গিত করছে, জ্বালানি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ আগের তুলনায় বেড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম কিছুটা বেড়েছে বলে স্বীকার করলেও সেটিকে তার প্রশাসনের বৃহত্তর নিরাপত্তা লক্ষ্যের তুলনায় সীমিত মূল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। নর্থ ক্যারোলিনায় এক প্রচার সমাবেশে তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে বিভিন্ন ভোটার জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে নিজেদের দৈনন্দিন আর্থিক চাপের কথা জানিয়েছেন।
পেট্রলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানি খরচেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসার পরিচালন ব্যয়েও চাপ পড়তে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল ও পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজার এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে চাপ কতদিন থাকবে, সেটিই মার্কিন ভোক্তা, ব্যবসা এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।




