মিশিগানের ডিয়ারবর্নে পবিত্র রমজান উদযাপনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে মামলা

মিশিগানের ডিয়ারবর্ন শহরে রমজান উপলক্ষে সরকারি অর্থ ব্যয় ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে সমান সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা।

মিশিগানের ডিয়ারবর্নে পবিত্র রমজান উদযাপনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে মামলা

মিশিগানের ডিয়ারবর্নে পবিত্র রমজান উদযাপনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে মামলা


যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডিয়ারবর্ন শহরে পবিত্র রমজান উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি সজ্জা ও প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক এবার গড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আইনি প্রাঙ্গণে। ডিয়ারবর্ন শহরের প্রশাসন ও প্রথম মুসলিম মেয়র আব্দুল্লাহ হামুদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব মিশিগানের ফেডারেল জেলা আদালতে একটি গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। শহরের স্থানীয় একজন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নাগরিক এই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার অভিযোগ, শহর প্রশাসন বিশেষ একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব উদযাপনে সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করলেও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রধান পবিত্র দিনগুলোতে অনুরূপ সুযোগ বা স্বীকৃতি দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে, যা মার্কিন সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।


আদালতের নথি ও মামলার বিবরণী থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মারগোট ক্লেভল্যান্ড নামের ওই স্থানীয় বাসিন্দা গত সতেরো সেপ্টেম্বর ডিয়ারবর্ন শহর কর্তৃপক্ষ এবং মেয়র আব্দুল্লাহ হামুদের বিরুদ্ধে এই নজিরবিহীন আইনি লড়াই শুরু করেন। অভিযোগের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিগত বছরের শহর কর্তৃপক্ষের একটি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। সেখানে দাবি করা হয়, গত বছর রমজান মাস উপলক্ষে ডিয়ারবর্ন শহরের প্রধান প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চত্বর এবং পাবলিক পার্কগুলোতে বিশেষ ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, যাতে লেখা ছিল 'রমজান করিম'। একই সাথে শহরের একটি প্রধান পাবলিক স্পেসে বিশাল আকৃতির একটি আলোকিত অর্ধচন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা রাতের বেলা আলোকসজ্জায় সুসজ্জিত থাকত।


উক্ত বাসিন্দা তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে শহর কর্তৃপক্ষের কাছে এই প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত বিবরণী জানতে চেয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আবেদন জমা দেন। সেই আবেদনের উত্তর হিসেবে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, শহর প্রশাসন শুধুমাত্র রমজানের শুভেচ্ছা সম্বলিত ব্যানার তৈরির জন্য সরকারি তহবিল থেকে প্রায় পંદરশত মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এর পাশাপাশি পাবলিক স্পেসে উন্মুক্ত করা বিশালাকার আলোকিত অর্ধচন্দ্র স্থাপন ও এর বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করা হয়েছে। সাধারণ করদাতাদের অর্থের এই ধরনের ব্যবহারে ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে বলে বাদীর পক্ষে অভিযোগ তোলা হয়।


তবে বাদী মারগোট ক্লেভল্যান্ড আদালতের সমন ও আরজিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তার এই আইনি লড়াইয়ের উদ্দেশ্য রমজানের ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনী বন্ধ করা বা শহর থেকে এগুলো সরিয়ে ফেলা নয়। তিনি কখনোই মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব পালনে বাধা সৃষ্টি করতে চাননি। তার মূল দাবি ছিল শহরের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়, বিশেষ করে খ্রিস্টানদের প্রধান পবিত্র উৎসব 'ইস্টার' এবং ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী ও পবিত্র 'পাসওভার' উদযাপনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সরকারি স্বীকৃতি ও ব্যানার প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া। মামলায় যুক্ত করা একটি আনুষ্ঠানিক ইমেইল বার্তায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি কোনো ধর্মীয় আয়োজন বা সজ্জা বন্ধের পক্ষে নন, বরং তিনি ডিয়ারবর্নে বসবাসকারী প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসারীদের জন্য 'ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমতা' ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছেন।
মামলার নথিতে বাদীপক্ষ সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেছে যে, শহর প্রশাসনের এই ধরনের একপেশে সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য ধর্মের আবেদন উপেক্ষা করার নীতি মার্কিন সংবিধানের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বা প্রথম সংশোধনীতে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারকে সরাসরি ক্ষুণ্ন করেছে। একই সাথে এটি সংবিধানের ফোরটিথ অ্যামেন্ডমেন্ট বা চতুর্দশ সংশোধনীতে নিশ্চিত করা 'আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার' বা সমতার মূলনীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। মার্কিন সংবিধানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বা কোনো সরকারি সংস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে বিশেষ অনুগ্রহ প্রদান করতে পারবে না এবং সকল নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সুবিধায় সমান সুযোগ দিতে হবে।
যদিও এই সমস্ত লিখিত বক্তব্য ও তথ্য বাদীপক্ষের তোলা প্রাথমিক অভিযোগ হিসেবে আদালতে নথিভুক্ত হয়েছে। বিচারক বা উচ্চ আদালত এখনো এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রায় ঘোষণা করেননি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে ডিয়ারবর্ন শহর প্রশাসন ও মেয়র আব্দুল্লাহ হামুদের আইনজীবীরা কী ধরনের লিখিত জবাব এবং আইনি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এই বিতর্কের ভবিষ্যত গতিপথ।


বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইনি প্রক্রিয়ার মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সরকারি অর্থ ও সম্পদ ব্যবহার করে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসবকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় বা নগরীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পর, শহর কর্তৃপক্ষ আইনত অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও সমান সুবিধা ও সুযোগ দিতে বাধ্য কি না। মিশিগানের মতো বহুসংস্কৃতি ও বহুজাতির অঙ্গরাজ্যে এই মামলার রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে ধারণা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ডিয়ারবর্ন শহর কর্তৃপক্ষ এখন আদালতে নিজেদের পদক্ষেপের সাংবিধানিক বৈধতা প্রমাণে কেমন যুক্তি উপস্থাপন করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর